সুনামগঞ্জে সড়ক প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, বিএনপির সংবাদ সম্মেলন
সংগৃহীত
মোঃ শরীফ উদ্দিন, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার লালপুর–সালামপুর সেতু ও সড়কের সংস্কারকাজে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ তুলেছে জেলা বিএনপি। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুলের বিরুদ্ধে সাব-ঠিকাদার শফিকুল ইসলামের মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের প্রতিবাদ জানিয়েছে দলটি। প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে জেলা বিএনপি।
সোমবার (২ নভেম্বর) সাংবাদিকদের উদ্দেশে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০২২ সালের বন্যায় সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু ও কালভার্ট জরুরি পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জ-কাচিঁরগাতি-বিশ্বম্ভরপুর সড়কের লালপুর–সালামপুর সেতুর ১ ও ২ নম্বর অংশ এবং প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কের সংস্কার ও গার্ডওয়াল নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
বিএনপির লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ পান রাজধানী ঢাকার ঠিকাদার ও আওয়ামী লীগ সমর্থক মো. বদরুল ইসলাম। তাঁর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ফার্ম ইসলাম ট্রেডার্স। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই ঠিকাদার দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে প্রকল্পের প্রথম সাব-ঠিকাদার হিসেবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা ও সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আজাদ হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে মতবিরোধের কারণে পরবর্তীতে দ্বিতীয় সাব-ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ পান আরেক আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল ইসলাম। লিখিত বক্তব্যে তাঁকে সন্ত্রাস দমন আইন ও প্রতারণাসহ একাধিক মামলার আসামি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বক্তব্যে আরও বলা হয়, গত ২৭ অক্টোবর সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল বিশ্বম্ভরপুরের রতারগাঁও হাইস্কুলে একটি অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্মাণাধীন সড়ক ও সেতুর কাজ পরিদর্শন করেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ জানান।
পরিদর্শনকালে সড়কের সদ্য নির্মিত গার্ডওয়াল একদিকে হেলে পড়া, ব্লক নির্মাণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, মাটি কম্প্যাকশন না করে জিও টেক্সটাইলের ওপর নিম্নমানের ব্লক বসিয়ে সড়কের সুরক্ষা দেওয়া এবং ভিট বালুর পরিবর্তে কৃষিজমির মাটি ব্যবহারের বিষয়গুলো তাঁর নজরে আসে বলে লিখিত বক্তব্যে দাবি করা হয়।
এ সময় সংসদ সদস্য স্থানীয় ঠিকাদারকে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে পরদিন সরেজমিনে কাজ পরিদর্শনের কথাও ঠিকাদারের প্রতিনিধিকে জানান বলে বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, প্রকল্পের প্রথম সাব-ঠিকাদারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বিএনপি নেতারা দাবি করেন, প্রকৃতপক্ষে ৪০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে ৮৭ কোটি টাকা ব্যয় দেখানোর জন্য ওভার এস্টিমেট করা হয়েছিল। নির্মাণকাজে সাত লাখ ঘনফুট মাটির পরিবর্তে ৫৬ লাখ ঘনফুট মাটি ধরা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
বিএনপির অভিযোগ, প্রকল্পের সাব-ঠিকাদারদের যোগসাজশে ব্যাপক অনিয়ম হচ্ছে। উত্তোলিত বিলের টাকা সড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের প্রতিনিধিরা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করে লুটপাট করা হয়েছে বলেও দাবি করে দলটি। এ ছাড়া জনগণের সামনে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ের কোনো সাইনবোর্ড প্রদর্শন করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।
জেলা বিএনপির পাঁচ দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরে জেলা বিএনপি।
1. প্রকল্পের শুরু থেকেই দুর্নীতির যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
2. প্রকল্পের প্রকৃত মূল্য পুনর্মূল্যায়ন করে অতিরিক্ত মূল্য (ওভার ভ্যালু) দেখিয়ে যে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, তা দুর্নীতিতে জড়িত ঠিকাদারদের কাছ থেকে সরকারি কোষাগারে ফেরত আনতে হবে।
3. ইতোমধ্যে নিম্নমানের যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলো বাতিল করে নকশা অনুযায়ী মানসম্পন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার নিশ্চিত করে নতুন করে কাজ করতে হবে।
4. সংস্কারকাজ বাস্তবায়নে সড়ক বিভাগের যেসব প্রকৌশলী জড়িত এবং জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কারে যাঁদের দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
5. দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চলমান সব কাজ এবং সেসব কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে জেলা বিএনপির নেতারা বলেন, জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন এবং জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। এ সময় সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত বিষয়গুলো জনসম্মুখে তুলে ধরতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান তাঁরা।
লিখিত বক্তব্যে স্বাক্ষর করেন সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন এবং জেলা বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল হক।
এমকে/বিএম২৪








