শরীয়তপুরে গোবরের বায়োগ্যাসে জ্বলছে ৩০ পরিবারের চুলা, সানজিদুলের বছরে আয় ১০ লাখ টাকা

প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম
শরীয়তপুরে গোবরের বায়োগ্যাসে জ্বলছে ৩০ পরিবারের চুলা, সানজিদুলের বছরে আয় ১০ লাখ টাকা

সংগৃহীত

রবিউল মোল্লা, শরীয়তপুর জেলা প্রতিনিধি


সিলিন্ডার গ্যাসের সংকট ও বাড়তি দামের মধ্যে বিকল্প জ্বালানির সম্ভাবনা দেখাচ্ছেন শরীয়তপুরের তরুণ উদ্যোক্তা সানজিদুল ইসলাম। গরুর গোবর থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করে প্রায় দেড় কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে ৩০টি পরিবারের রান্নাঘরে জ্বালানি পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। একই সঙ্গে গ্যাস উৎপাদনের পর অবশিষ্ট বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করছেন জৈব সার। তাঁর এ উদ্যোগে একদিকে কমছে পরিবারের রান্নার খরচ, অন্যদিকে গোবর পরিণত হচ্ছে মূল্যবান সম্পদে।


শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার ডিএমখালী ইউনিয়নে স্থাপন করা হয়েছে সানজিদুলের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার কেজি গরুর গোবর ব্যবহার করে উৎপাদন করা হচ্ছে বায়োগ্যাস। পরে প্রায় দেড় কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে ৩০টি পরিবারের রান্নাঘরে সরবরাহ করা হচ্ছে এ গ্যাস।


শুধু গ্যাস উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয় তাঁর উদ্যোগ। বায়োগ্যাস তৈরির পর অবশিষ্ট উপাদান ফেলে না দিয়ে তা প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হচ্ছে জৈব সার। ফলে একই উদ্যোগ থেকে পাওয়া যাচ্ছে রান্নার জ্বালানি ও কৃষিকাজের উপযোগী সার। পাশাপাশি গরুর খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও হচ্ছে পরিবেশবান্ধব উপায়ে।


বগুড়ায় দেখে স্বপ্ন, প্রবাস থেকে ফিরে বাস্তবায়ন


২০১৮ সালে এসএসসি পাস করার পর ড্রাইভিং শেখার জন্য বগুড়ায় যান সানজিদুল ইসলাম। সেখানে একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট দেখে প্রথমবারের মতো তাঁর মনে আগ্রহ তৈরি হয়। গরুর গোবর থেকেও যে রান্নার জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব, তা তাঁকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।


সেই সময় থেকেই নিজের এলাকায় এমন একটি প্ল্যান্ট স্থাপনের স্বপ্ন দেখেন তিনি। তবে জীবিকার প্রয়োজনে কিছুদিন পর প্রবাসে পাড়ি জমান। প্রায় সাত বছর প্রবাসজীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে পুরোনো স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন।


মামার গরুর খামারের পাশে প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করেন সানজিদুল। ২০২৬ সালে প্রায় ১১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে শুরু করেন বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট নির্মাণের কাজ। উৎপাদন শুরু হওয়ার পর প্রায় এক মাস আগে স্থানীয় ৩০টি পরিবারের সঙ্গে সংযোগ দিয়ে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ ও জৈব সার বিক্রি করে সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করছেন বলে জানান এ উদ্যোক্তা।


স্বস্তিতে গ্রাহকেরা, আগ্রহ বাড়ছে অন্যদেরও


সানজিদুলের প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস পাওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে বাড়তি টাকা খরচের পাশাপাশি অনেক সময় প্রয়োজনের মুহূর্তে গ্যাস পাওয়া যায় না। তবে পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়মিত গ্যাস পাওয়ায় সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে।


গ্রাহক রেহানা পারভিন বলেন, ‘সিলিন্ডার গ্যাসের তুলনায় এতে আমরা অনেকটাই স্বস্তি পাচ্ছি। কম টাকায় গ্যাস পাচ্ছি, বিশেষ করে সব সময় পাওয়া যাচ্ছে। এর তাপও বেশি। আমার স্বামী বাইরে থাকেন। সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে গেলে দোকানে নিতে হয়, আবার আনতে হয়। এতে অনেক ভোগান্তি হয়। এখন এসব চিন্তা নেই, শুধু মাসে বিল দিলেই হয়।’


সানজিদুলের উদ্যোগ স্থানীয় পরিবারগুলোর রান্নার জ্বালানির সংকট কিছুটা কমানোর পাশাপাশি অন্যদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। প্ল্যান্ট দেখতে এসে অনেকে এমন উদ্যোগ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন।


স্থানীয় জহির উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এলাকার ছেলে গোবর থেকে গ্যাস উৎপাদন করে পাইপের মাধ্যমে মানুষের বাড়িতে সরবরাহ করে অর্থ উপার্জন করছে—বিষয়টি আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। তাই দেখতে এসেছি। আমারও ইচ্ছা আছে, তাঁর কাছ থেকে জেনে আমিও এমন একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করব।’


তিনি আরও বলেন, সানজিদুলের এ উদ্যোগ এলাকার যুবসমাজের জন্য রোল মডেল হয়ে থাকবে। বেকার না থেকে তরুণদের এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, ছোট উদ্যোগ থেকেই একসময় বড় কিছু করা সম্ভব।


১০০ পরিবারে গ্যাস সংযোগের স্বপ্ন


বর্তমানে ৩০টি পরিবারকে গ্যাস সংযোগ দিলেও সানজিদুলের পরিকল্পনা আরও বড়। ভবিষ্যতে প্ল্যান্টের পরিধি বাড়িয়ে অন্তত ১০০টি পরিবারে গ্যাস সরবরাহের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।


সানজিদুল ইসলাম বলেন, ‘বগুড়ায় গিয়ে এমন একটি প্ল্যান্ট দেখে আমার ইচ্ছা হয়েছিল এলাকায় একটি প্ল্যান্ট করব। কিন্তু বিদেশে চলে যাওয়ায় তখন আর করা হয়নি। সাত বছর পর দেশে ফিরে সেই ইচ্ছা থেকেই ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে প্ল্যান্টটি স্থাপন করি। বর্তমানে এখান থেকে উৎপাদিত গ্যাস ৩০টি বাড়িতে সরবরাহ করছি। পাশাপাশি জৈব সারও তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় হচ্ছে।’


ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটিকে আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন ৩০টি বাড়িতে সংযোগ দিয়েছি। যদি ১০০টি বাড়িতে সংযোগ দিতে পারি, তাহলে এলাকায় সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা কিছুটা কমবে।’


তরুণদের উদ্দেশে সানজিদুল বলেন, প্রতিটি এলাকায় এ ধরনের প্ল্যান্ট স্থাপন করা গেলে দেশের চলমান গ্যাসসংকট মোকাবিলায় তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।


বর্জ্য থেকে সম্পদ, বদলাতে পারে গ্রামের অর্থনীতি


গ্রামীণ এলাকায় গরুর গোবর সাধারণত বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হলেও সানজিদুলের উদ্যোগ দেখাচ্ছে, সেই গোবরই হতে পারে রান্নার জ্বালানি ও কৃষির উপযোগী সার তৈরির কাঁচামাল। এতে একদিকে খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে নতুন আয়ের সুযোগ। স্থানীয় পর্যায়ে এমন উদ্যোগ সম্প্রসারিত হলে বিকল্প জ্বালানির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


এমকে/বিএম২৪