মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে তিন নারীর কবর খোঁড়ার ছবি ভাইরাল, যা জানা গেল

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৬ পিএম
মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে তিন নারীর কবর খোঁড়ার ছবি ভাইরাল, যা জানা গেল

সংগৃহীত

জেলা প্রতিনিধি


পিরোজপুরে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফনকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিন নারী মিলে তাঁর কবর খুঁড়েছেন—এমন একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে স্থানীয় গ্রাম পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কবর খোঁড়ার সময় ওই নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও উপস্থিত ছিলেন। ফলে তিন নারী একাই কবর খুঁড়েছেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবি পুরোপুরি সঠিক নয়।


প্রয়াত জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন নিয়ে এ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।


ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় গ্রাম পুলিশ মতিউর রহমান জানান, গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে মানিক পশারীর বাড়ির কাছে প্রথমে তাঁর কবর খোঁড়া হয়। তবে মাগরিবের পর একদল লোক কবরটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়। পরে রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে পুনরায় কবর খোঁড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।


মতিউর রহমান বলেন, কবর খোঁড়ার সরঞ্জাম আনতে তিনি মানিক পশারীর এক বোনের বাড়িতে যান। পরে ওই বোনসহ আরও দুই নারী সেখানে আসেন। তিনি কবর খোঁড়ার জন্য লোক খুঁজতে গেলে নারীরা মাটি সরানোর কাজ শুরু করেন। এ সময়ের ছবিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।


তাঁর ভাষ্য, তিনি ও স্থানীয় আরেক ব্যক্তি মিলে কবর খুঁড়েছেন। নারীরা তাঁদের সহযোগিতা করেছেন। পরে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তিনজন গ্রাম পুলিশ এবং স্থানীয় দুই ব্যক্তির সহায়তায় দাফন সম্পন্ন হয়।


পরিবারের অভিযোগ, ভয়ে সরে যান অনেকে


মানিক পশারীর বোন হেনা পশারী জানান, প্রথমবার কবর খোঁড়ার সময় পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনও উপস্থিত ছিলেন। তবে সন্ধ্যার পর কবর ভরাট এবং হুমকির ঘটনার পর অনেকে ভয়ে সেখান থেকে চলে যান।


তাঁর অভিযোগ, জামায়াত-শিবিরের লোকজন এসে কবর ভরাট করে দেন। মিছিল করে মানিক পশারী ও তাঁর ছেলের কবরেও জুতা মারার কথা বলা হয়েছিল। সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে কবর ভরাটের হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।


হেনা পশারী বলেন, তাঁর ভাইয়ের ছোট মেয়ে ও তাঁরা দুই বোন মিলে কবর খোঁড়ার কাজে অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে আরও দুজন পুরুষ ছিলেন। পরে রাতে প্রশাসনের লোকজন এসে তাঁর ভাইকে দাফন করেন।


পুলিশ ও জামায়াতের বক্তব্য


পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের উপস্থিতিতে মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং শান্তিপূর্ণভাবেই তাঁকে দাফন করা হয়েছে।


অন্যদিকে, কবর ভরাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা জামায়াতের নেতারা। পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন বলে জানা গেছে। তবে দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।


মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিতর্ক


মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও স্থানীয় কয়েকজনের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন দাবি করেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা করা হয়েছিল। সাঈদীর পক্ষে বক্তব্য দিয়ে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগেরও বিরোধিতা করেন।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আরেক মুক্তিযোদ্ধা বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় মানিক পশারী চাপের মুখে বা অন্য কোনো কারণে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন বলে তাঁর ধারণা। এরপর তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা করা হয় এবং পরে আর যাচাই-বাছাই হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।


তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি। মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।


যেভাবে মারা যান মানিক পশারী


মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ে ও জামাতার বাড়িতে আশ্রয়ে ছিলেন। গত দুই মাস ধরে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।


গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ে-জামাতার বাড়িতে ৮৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। দুপুরে মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনা হয়।


গার্ড অব অনার ও দাফন নিয়ে জটিলতার মধ্যে বিকেলে পুলিশ লাইনসে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে রাত ১টার দিকে মরদেহ নিজ বাড়িতে নেওয়া হয় এবং রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে দাফন সম্পন্ন হয়।


এমকে/বিএম২৪