তেঁতুলিয়ায় করতোয়া নদীতে বালু-পাথর লুট, অস্তিত্ব সংকটে নদী ও জনপদ

প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
তেঁতুলিয়ায় করতোয়া নদীতে বালু-পাথর লুট, অস্তিত্ব সংকটে নদী ও জনপদ

ছবি: বিডি মেইল


রাতের আঁধারে অবৈধ উত্তোলন, ঝুঁকিতে ফসলি জমি, চা বাগান ও বসতবাড়ি


সাইয়্যেদ মুহাম্মদ শান্ত, পঞ্চগড় প্রতিনিধি


পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার করতোয়া নদীতে রাতের আঁধারে অবাধে চলছে অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজার, মোটর ও পাইপ বসিয়ে এ কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি ঝুঁকিতে রয়েছে ফসলি জমি, তীররক্ষা বাঁধ, চা বাগান ও জনবসতি।


স্থানীয়দের অভিযোগ, আইন ও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নদীর বুক থেকে বালু-পাথর উত্তোলন করে ট্রাক্টর ও ট্রলির মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। অব্যাহত এ কর্মকাণ্ডে নদীর তীর ভাঙন বাড়ছে। এতে নদী ও আশপাশের জনপদ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।


যেসব এলাকায় চলছে অবৈধ উত্তোলন


অনুসন্ধানী তথ্য ও ভিডিও চিত্রে তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের কালিয়ামনি, ভেলুপাড়া, কুকুরমুহু ও গনাগচ গ্রামসহ করতোয়া নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের চিত্র উঠে এসেছে।


অভিযোগ রয়েছে, সংঘবদ্ধ ছোট ছোট চক্র দিনের আলোতে ও রাতের আঁধারে নদীর বুক চিরে শক্তিশালী মোটর ও পাইপের সাহায্যে বালু-পাথর উত্তোলন করছে। পরে এসব বালু-পাথর ট্রাক্টর ও ট্রলিতে করে বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে।


অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে অনেক আবাদি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।


ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে এলাকার অর্থনীতি ও কৃষির অন্যতম চালিকাশক্তি চা বাগান, মৎস্য অভয়াশ্রম, স্থানীয় বসতবাড়ি এবং ঐতিহাসিক কালিয়ামনি শ্মশানঘাট। এভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে নদীতীরবর্তী বসতি ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


নদীতীরবর্তী বাসিন্দারা জানান, বালু উত্তোলনের কারণে ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচলে গ্রামীণ রাস্তাঘাটও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীভাঙন ও আবাদি জমি হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষিজীবী ও সাধারণ মানুষ।


তাদের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে প্রশাসনের অভিযান দেখা গেলেও অবৈধ উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় এ কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না। করতোয়া নদী রক্ষা করা না গেলে বসতভিটা ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারানোর আশঙ্কা করছেন তারা।


প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত


অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার হোসেন জানান, নদী রক্ষা ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া জড়িতদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু অবৈধ সরঞ্জাম ও আলামত জব্দ করা হয়েছে।


তিনি বলেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসনের অভিযান সর্বাত্মক ও নিয়মিতভাবে চলমান থাকবে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।


ইউএনও আরও বলেন, অভিযানে কেউ অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত বা ধরা পড়লে প্রচলিত আইনের আওতায় সর্বোচ্চ আইনি শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।


নদী রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের দাবি


পরিবেশবাদীদের মতে, করতোয়া নদীর মতো প্রাকৃতিক উৎস থেকে অবৈধ ও যান্ত্রিক উপায়ে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে তা নদীর ভূপ্রকৃতি ও উত্তরাঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করবে।


তাদের মতে, শুধু সাময়িক অভিযান নয়, অবৈধ উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তা না হলে করতোয়া নদী ও এর তীরবর্তী জনপদকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।