কাপ্তাই পাহাড়ে জুমের সোনালি উৎসব, ধান কাটায় ব্যস্ত জুমিয়ারা

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২২ পিএম
কাপ্তাই পাহাড়ে জুমের সোনালি উৎসব, ধান কাটায় ব্যস্ত জুমিয়ারা

সূত্রঃ বিডি মেইল

চাই সুই উ মারমা, রাঙামাটি প্রতিনিধি


আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনযাত্রায় জুমচাষ এখনো জীবিকা ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার দুর্গম পাহাড়গুলোতে চলছে জুমের ধান কাটার মৌসুম। কোথাও ধান কাটা, কোথাও মাড়াই—সব মিলিয়ে পাহাড়জুড়ে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে সোনালি ধানের হাসির আড়ালে জুমিয়াদের রয়েছে নানা আক্ষেপ ও হতাশাও।


কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরমের জামাইছড়ি, সীতাপাহাড়, চাকুয়াপাড়া, মৈদং, আড়াছড়ি, হরিণছড়া, ব্যাঙছড়ি, ওয়াগ্গার রামপাহাড় ও মইংপাড়াসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় এখন জুমচাষের ব্যস্ততা। বিশেষ করে চিৎমরমের জামাইছড়িতে প্রায় এক হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ে মারমা সম্প্রদায়ের জুমিয়ারা বংশপরম্পরায় এ চাষাবাদ করে আসছেন।


কাপ্তাই উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় মোট ৩৩৬ হেক্টর জমিতে জুমচাষ হয়েছে। এতে পাহাড়ি বিভিন্ন জাতের ধানের পাশাপাশি নানা ধরনের ফসলের আবাদ করা হয়েছে।


জুমে চাষ করা ধানের মধ্যে রয়েছে তুর্কি, গ্যালন, দুলি, মাংসাই, বাসমতি, বাঁশ, পাত্তিকী, বিন্নি ও কবরকসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি জাত। ধানের পাশাপাশি কলা, হলুদ, আদা, পেঁপে, পাহাড়ি আলু, তিল-তিষী, পাহাড়ি মরিচ, বেগুন, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, শিম ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন শাকসবজিও চাষ করা হয়।


প্রতিকূলতার মধ্যেই জুমচাষ


পাহাড়ে জুমচাষ করা সহজ নয়। তীব্র রোদ, বৃষ্টি, বন্যপ্রাণীর ঝুঁকি এবং দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে জুমের জমিতে যেতে হয় কৃষকদের। অনেক সময় পাহাড়ের চূড়ায় মাচাং ঘর তৈরি করে রাতেও ফসল পাহারা দিতে হয় তাদের।



ফাল্গুন-চৈত্রে পাহাড় পরিষ্কার করে জুমের জমি প্রস্তুত করা হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে বীজ বপন করা হয়। এরপর ভাদ্র থেকে অগ্রহায়ণ পর্যন্ত ধাপে ধাপে বিভিন্ন ফসল ঘরে তোলেন জুমিয়ারা। মূলত বর্ষার বৃষ্টির ওপর নির্ভর করেই পরিচালিত হয় এই চাষাবাদ।


জুমচাষিদের হিসাবে, একটি জুমে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং ফলন ভালো হলে প্রায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। তবে চলতি মৌসুমে কোথাও কোথাও পোকার আক্রমণ ও পরিচর্যার ঘাটতির কারণে ফলন নিয়ে হতাশা রয়েছে।


স্থানীয় জুমিয়া সুইহ্লামং মারমা ও উসুইসিং মারমা বলেন, সময়মতো কীটনাশক ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাওয়া গেলে ফলন আরও ভালো হতে পারত। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা পাওয়ার প্রত্যাশাও জানান তারা।


পানির সংকট বড় বাধা


জুমচাষিদের আরেকটি বড় সমস্যা পানির সংকট। মৈদং ও ব্যাঙছড়ি পাহাড়ের জুমচাষি সাইংসুই ও স্বপ্না মারমা জানান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল চাষে পানির সংকট রয়েছে। সরকারিভাবে সেচ বা পানির ব্যবস্থা করা গেলে আরও বড় পরিসরে চাষাবাদ করা সম্ভব হতো বলে মনে করেন তারা।


কৃষি বিভাগের সহযোগিতার আশ্বাস


কাপ্তাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আহসান হাবীব বলেন, পাহাড়ের মানুষের কাছে জুমচাষ একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হচ্ছে।


তিনি বলেন, জুমচাষের কারণে পাহাড়ি মাটির কিছুটা ক্ষতি হলেও প্রতিবছর স্থান পরিবর্তন করে চাষাবাদ করায় বড় ধরনের ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকি অনেকটাই কম থাকে।


কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। জুমের ফলন ভালো হলে পাহাড়ি এলাকায় খাদ্যসংকটও কম থাকে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুমচাষ, উন্নত জাতের বীজ ও প্রয়োজনীয় সার সহজলভ্য করা গেলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।


তাদের মতে, উৎপাদন বাড়লে জুমিয়ারা নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত ফসল বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করতে পারবেন। একই সঙ্গে পানির ব্যবস্থা ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সুযোগ তৈরি হলে পাহাড়ি মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থারও উন্নতি হতে পারে।


প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি করে কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে জুমচাষ শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা ঐতিহ্যেরও প্রতিচ্ছবি। সোনালি ধান কাটার এই উৎসবের মধ্যেই তাই মিশে আছে জুমিয়াদের সংগ্রাম, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন।