উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে শত মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার অভিযোগ, ৭ মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত হাফিজ গ্রেপ্তার

প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৮ পিএম
উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে শত মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার অভিযোগ, ৭ মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত হাফিজ গ্রেপ্তার

সূত্রঃ সংগৃহীত

আনোয়ারুল ইসলাম রনি, রংপুর ব্যুরো


ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হাফিজুর রহমান মুকুলের বিরুদ্ধে। টাকা নেওয়ার পর তা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ভুক্তভোগী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে সাতটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।


দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর রংপুরের পীরগাছা উপজেলার পাওটানা এলাকা থেকে হাফিজুর রহমান মুকুলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের সদরা তালুক গ্রামের মৃত মোসলেম উদ্দিনের ছেলে।


শিক্ষকদের মাধ্যমে আস্থা তৈরির অভিযোগ


ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সমাজের পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিদের ব্যবহার করতেন হাফিজুর রহমান মুকুল। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, প্রভাষক, মাওলানা ও পরিচিত ব্যক্তিদের প্রথমে তার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা হতো। পরে তাদের পরিচিতজন ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছে ব্যবসার প্রচার করে নতুন বিনিয়োগকারী সংগ্রহ করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।


ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, সমাজে পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিরা ব্যবসাটির সঙ্গে যুক্ত থাকায় সাধারণ মানুষও এটিকে নিরাপদ মনে করতেন। পরে তাদের রেফারেন্স ব্যবহার করে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী করা হতো।


অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবে একের পর এক ব্যক্তি ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পর তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও অনেকে মূল টাকা কিংবা প্রতিশ্রুত মুনাফা ফেরত পাননি। টাকা ফেরতের জন্য চাপ দিলে হাফিজুর রহমান মুকুল আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।


বিনিয়োগের টাকা হারিয়ে আর্থিক সংকটে অনেকে


ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাফিজুর রহমান মুকুলের কাছে অর্থ দিয়ে অনেক পরিবার এখন আর্থিক সংকটে পড়েছে। কেউ জমি বিক্রির টাকা, আবার কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ তার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন বলে দাবি করেছেন।


বিনিয়োগের টাকা ফেরত না পাওয়ায় একদিকে ঋণের কিস্তির চাপ, অন্যদিকে সংসারের খরচ চালাতে গিয়ে অনেকেই সংকটে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কারও সঞ্চয় শেষ হয়েছে, কেউ জমি বিক্রির অর্থ হারিয়েছেন। আবার কেউ ঋণের চাপে বাড়ি ও পরিবার ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন।


রংপুরে একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ


মিঠাপুকুর উপজেলার হাসিব নামে এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে তার কাছ থেকে জমি বিক্রির প্রায় ৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।


মেকুরা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক মুজাহিদুল ইসলাম রেজার অভিযোগ, ব্যবসার কথা বলে তার কাছ থেকেও প্রায় আড়াই লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।


পীরগঞ্জের আসাদউদ্দৌলা নামে আরেক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে তার কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।


জাকির হোসেন নামে আরেক ব্যক্তির দাবি, তার কাছ থেকে এবং তার মাধ্যমে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে মোট ১২ লাখ টাকা ব্যবসায় বিনিয়োগ হিসেবে নেওয়া হয়েছে।


শারীরিক প্রতিবন্ধী আহসান হাবিবের অভিযোগ, ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে তার কাছ থেকেও ১ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে ওই অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও কয়েকজনের অভিযোগ, রংপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তাসহ সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও লালমনিরহাটেও অভিযোগ


চাঁপাইনবাবগঞ্জে শরীফ নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে ব্যবসায় বিনিয়োগের অর্থ সংগ্রহ করে হাফিজুর রহমান মুকুলের কাছে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত না পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে।


এ ছাড়া লালমনিরহাট সদরের একটি স্থানীয় এনজিওর সদস্যদের কাছ থেকেও উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবসার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ নেওয়ার পর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন হাফিজুর রহমান মুকুল।


ভুক্তভোগীদের অভিযোগে আরও উঠে এসেছে, ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ ও উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি শিক্ষক, মাওলানা ও পরিচিত ব্যক্তিদের রেফারেন্স ব্যবহার করে মানুষের আস্থা অর্জন করা হতো।


অর্থ উদ্ধারের দাবি ভুক্তভোগীদের


ভুক্তভোগীরা হাফিজুর রহমান মুকুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া অর্থের হিসাব ও লেনদেনের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের অর্থ উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।


এদিকে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, আত্মসাতের অভিযোগ থাকা অর্থ বিভিন্ন কারেন্সিতে রূপান্তর করে রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ তথ্যের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।


সাত মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা


কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন বলেন, **“তার নামে সাতটি ওয়ারেন্ট আছে। আমরা তাকে আদালতে সোপর্দ করেছি।”**


পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর হাফিজুর রহমান মুকুলকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং অর্থ লেনদেনের প্রকৃত ঘটনা নির্ধারিত হবে।