পাসের হার কমছে, প্রশ্ন উঠছে আগের ফল নিয়ে
সূত্রঃ সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের পাবলিক পরীক্ষায় একসময় ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পাস করত। প্রতিবছর বাড়ত জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। কিন্তু সাম্প্রতিক দুই বছরে সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—আগের বছরগুলোতে এত বেশি শিক্ষার্থী কীভাবে পাস করছিল?
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। সে বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। এক বছর পর ২০২৬ সালে পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং জিপিএ-৫ কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬টি।
২০২৪ সালের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে পতনের চিত্র আরও স্পষ্ট। ওই বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন। দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৬৫ হাজারের বেশি।
দীর্ঘ সময়ের ফলাফল পর্যালোচনা করলেও পরিবর্তনের মাত্রা বোঝা যায়। ২০০১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল মাত্র ৩৫ দশমিক ২২ শতাংশ। এরপর ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। ২০০৯ সালে পাসের হার দাঁড়ায় ৬৭ দশমিক ৪১ শতাংশে, ২০১১ সালে ৮২ দশমিক ৩১ শতাংশে এবং ২০১৪ সালে রেকর্ড ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশে পৌঁছে।
পরবর্তী বছরগুলোতেও উচ্চ পাসের হার বজায় ছিল। করোনাকালে বিশেষ ব্যবস্থায় ২০২১ সালে এসএসসিতে পাসের হার ৯৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। তবে এরপর থেকে ফলাফলে ধারাবাহিক পতন দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমেছে পাসের হার।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২২ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় রেকর্ড ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালে তা কমে ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ এবং ২০২৬ সালে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক ফলাফলে বড় পরিবর্তনের অন্যতম কারণ উত্তরপত্র মূল্যায়নে কড়াকড়ি। দীর্ঘদিন ধরে পাস নম্বরের কাছাকাছি থাকা শিক্ষার্থীদের কিছুটা বাড়তি নম্বর দেওয়া, গ্রেডের সীমার কাছাকাছি থাকলে পরের গ্রেডে তুলে দেওয়া কিংবা অসম্পূর্ণ উত্তরের ক্ষেত্রেও তুলনামূলক বেশি নম্বর দেওয়ার প্রবণতা ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষার্থীর লিখিত উত্তরের ভিত্তিতে প্রাপ্য নম্বর দেওয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে শুধু বেশি লিখলেই নম্বর পাওয়া যাচ্ছে না; উত্তর কতটা সঠিক ও প্রশ্নের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক, সেটিই মূল্যায়নের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আক্তারুজ্জামানের ভাষ্য, মূল্যায়নে কোনো বিশেষ উদার বা কঠোর নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। বরং বাস্তবসম্মত ও সঠিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিমভাবে পাসের হার বা জিপিএ-৫ বাড়ানো নয়, যোগ্য শিক্ষার্থীকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করাই মূল লক্ষ্য।
শিক্ষাবিদদের অনেকে মনে করেন, পাসের হার কমে যাওয়াকে শুধু নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে বেশি শিক্ষার্থীকে পাস করানোর চেয়ে প্রকৃত মূল্যায়নের মাধ্যমে যোগ্যদের চিহ্নিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বর্তমান পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার বাস্তব চিত্র সামনে আসছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান মনে করেন, ফলাফল কমার কারণ শুধু মূল্যায়ন পদ্ধতিতে খুঁজলে হবে না। শিক্ষার্থীরা কোন বিষয়ে পিছিয়ে পড়ছে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও পাঠদানের মান কেমন, বিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ যথাযথ কি না এবং শহর-গ্রামের শিক্ষার্থীদের সুযোগের বৈষম্য কতটা—এসব বিষয়ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামের মতে, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল না করলে শুধু মূল্যায়ন কঠোর হওয়ার কথা বলে দায় এড়ানো যাবে না। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির সঙ্গে শিক্ষার্থীরা খাপ খাওয়াতে পারছে কি না, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা তৈরিতে দীর্ঘদিনের কোনো ঘাটতি আছে কি না—সেগুলোও খতিয়ে দেখা দরকার।
এদিকে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২২৬টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৫ সালে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩৪টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ১৭৮টি।
শূন্য পাসের এসব প্রতিষ্ঠানের ফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলো। এর অংশ হিসেবে দাখিল পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস না করা ২২৬টি মাদ্রাসার প্রধানদের বোর্ডে ডেকে কৈফিয়ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, একাডেমিক পরিবেশ, পাঠদান ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান জানিয়েছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের ফল খারাপ হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্তির বিষয়ও পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু পাসের হার বা জিপিএ-৫ দিয়ে শিক্ষার মান নির্ধারণ করা ঠিক নয়। একইভাবে ফলাফল কমে যাওয়াকেও স্বাভাবিক ধরে নেওয়া যাবে না। প্রকৃত মূল্যায়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান, সৃজনশীল চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, শিক্ষকদের সক্ষমতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ—সবকিছুর উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এমকে/বিএম২৪









