সাতক্ষীরার প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র স্থানীয় নেতৃত্বের কোন্দলের শিকার বিএনপির ত্যাগী ও তৃণমূলের জনপ্রিয় কাজী সোহেল

প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম
সাতক্ষীরার প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র স্থানীয় নেতৃত্বের কোন্দলের শিকার বিএনপির ত্যাগী ও তৃণমূলের জনপ্রিয় কাজী সোহেল

নিজস্ব প্রতিবেদক: 

রাজনীতির মাঠে সুদিন-দুর্দিন আসে যায়। কিন্তু দলের দুঃসময়ে যারা রাজপথে থাকেন, মামলা-হামলা ও নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের পাশে দাঁড়ান, তাদের রাজনৈতিক ত্যাগের মূল্যায়নই প্রত্যাশা করেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা কাজী সোহেলকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘটনায় এমনই প্রশ্ন উঠেছে তৃণমূলের বিভিন্ন মহলে।


কাজী সোহেলের দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু দল যখন দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে, তখনই স্থানীয় নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রের কারণে তাকে দল থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে তার বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশ আদায় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তার।


ছাত্ররাজনীতি থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্বে আসা এই ত্যাগী মানুষটা ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন বলে জানান। সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি শ্যামনগর সরকারি মহসীন কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি এবং নিজের জন্মস্থান কালিগঞ্জ উপজেলার ১২ নম্বর মৌতলা ইউনিয়ন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে কালিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং দীর্ঘদিন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর সাতক্ষীরা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং সর্বশেষ কালিগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালন এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার কারণে তৃণমূলে কাজী সোহেলের একটি নিজস্ব সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা যেমন তৈরি হয়েছে। তেমনই প্রতিপক্ষের চক্ষুশূল হয়েছেন তিনি।


কাজী সোহেল জানান, তার পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তার প্রয়াত ভাই কাজী আমিনুল ইসলাম ১২ নম্বর মৌতলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ছিলেন। তার মা মাহফুজা পারভীন কালিগঞ্জ উপজেলা জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাবা প্রয়াত কাজী আসাদুল ইসলাম ছিলেন বিএনপির কর্মী ও নিবেদিত সমর্থক ছিলেন।


কাজী সোহেল বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০০৮ সালে রাজনৈতিক হামলায় আহত হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে একাধিক রাজনৈতিক মামলায় তাকে ও তার প্রয়াত বাবাকে আসামি ও গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘদীন থেকেছেন কারাগারে।


তিনি অভিযোগ করে বলেন, শুধু রাজনীতি করার কারণে তার বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুরের পাশাপাশি পরিবারের প্রায় ১৩ বিঘা জমি প্রতিপক্ষ দখল করে নেয়। এছাড়া তার পিতার পৈতৃক সম্পত্তির একটি অংশ দখল করে সেখানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় নির্মাণ করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।


কাজী সোহেল আক্ষেপের সাথে বলেন বিএনপির দুঃসময়ে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের পাশে ছিলাম। কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষিত বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও খুলনার বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও নেতা কর্মীদের নিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে অগ্রজ ভুমিকা পালন করেছি ২৮ অক্টোবর ঢাকার মহাসমাবেশ, ঢাকার গোলাপবাগের কর্মসূচিসহ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দলের দুঃসময়ে ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে কর্মী-সমর্থকদের পাশে থেকেছি। প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠনকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।


এছাড়াও, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে তিনি ওয়ার্ড থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাতক্ষীরা-৩ আসনে ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী আলহাজ্ব কাজী আলাউদ্দিনের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা, কর্মী সমন্বয় ও বিভিন্ন নির্বাচনী কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন বলে তিনি দাবি করেন।


তিনি আরো বলেন দুঃসময়ে যারা মাঠে ছিলাম সু-সময় আসার পর দুধের মাছিদের ষড়যন্ত্র আর অপকৌশলে তাদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।


স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ ও ব্যক্তিস্বার্থকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে আমাকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে। এর ফলেই দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত আসে।


মৌতলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মুন্সি তাহমিদুল ইসলাম মিন্টু, ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব শেখ তুহিনুর রহমান, কালিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক কাজী শরিফুল ইসলাম, বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ মোস্তফা, মথুরেশপুর ইউনিয়ন বিএনপি সদস্য সচিব সৈয়দ হেমায়েত বাবু জানান কাজী সোহেলের মতো একজন জনবান্ধন মানুষকে দল থেকে দূরে রাখতে প্রতিপক্ষ তো আছেই সাথে সাথে দলের মধ্যও একটি স্বার্থানেশ্বী মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তবে তাকে দল যদি দূরে ঠেলে দেয় সেটা ভুল সিদ্ধান্ত হবে তার মতো মানুষকে দল ধরে রাখতে পারলে দলেরই উপকার হবে স্থানীয় সংগঠন মজবুত হবে।


তৃণমূলে কাজ করা ত্যাগী কাজী সোহেলের বহিষ্কারাদেশ পুনর্বিবেচনার দাবি করে কালিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ডা. শফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, কাজী সোহেল দলের ক্রান্তিকালের পরীক্ষিত নেতা। তার পরিবার দীর্ঘদিন বিএনপির আদর্শিক রাজনীতি করে আসছে তাকে বাদ দেওয়ায় স্থানীয়ভাবে দল যেমন ক্ষতির মুখে পড়ছে, তেমনি ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হচ্ছে।


উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক প্রভাষক সাইফুল ইসলাম বলেন, দলের খারাপ সময়ে দীর্ঘদিন একসঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। কাজী সোহেল ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বহিষ্কৃত হয়েছেন বলে আমরা মনে করি। তার ত্যাগ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বিবেচনা করে বহিষ্কারাদেশ পুনর্বিবেচনা করা উচিত।


কাজী সোহেলের বহিষ্কারকে ঘিরে এখন তৃণমূলে এমনই প্রশ্ন—এটি কি দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের স্বাভাবিক সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, নাকি স্থানীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক বিরোধের ফল?


কাজী সোহেল ও তার সমর্থকদের দাবি, তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক কোন্দলের শিকার। অন্যদিকে দলীয় সিদ্ধান্তের পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা বিএনপির সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল নেতাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।


তবে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছেন, কোনো নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ ও সাংগঠনিক ভূমিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।


দলের দুঃসময়ে রাজপথে থাকা একজন কর্মীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যদি স্থানীয় কোন্দল বা ভুল বোঝাবুঝির কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে তার প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির ওপর নয়, তৃণমূূল সংগঠনের মনোবলের ওপরও পড়তে পারে—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। দল ও আদর্শিক লড়ায়ে তার ত্যাগ সংগ্রাম ও স্থানীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে কাজী সোহেলের বহিষ্কারাদেশ পুনর্বিবেচনা ও পূনতদন্ত করে দল নতুন করে সিদ্ধান্ত নেবে — সেই প্রত্যাশায় কালিগঞ্জের বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা।