ক্ষমতায় আট মাসে বিএনপি সরকারের অর্জন-ব্যর্থতা কতটা?
সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আট মাস পেরিয়েছে। এই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। তবে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দলবদ্ধ সহিংসতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। পররাষ্ট্রনীতিতেও কিছু অগ্রগতি থাকলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জটিলতা কাটেনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১১ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়। মার্চে জ্বালানি সরবরাহের সংকট মোকাবিলায় রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে নানা সংকট পেয়েছে। তবে আট মাসের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো মানুষের জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বাধীনতায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে মিশ্র চিত্র
বিএনপি সরকারের আট মাসেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। পুলিশের মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হত্যা, ডাকাতি ও অপহরণের মামলা কমেছে। তবে চুরির মামলা বেড়েছে এবং গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আট মাসে পুলিশ ২ হাজার ১২২টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত করেছে, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ২ হাজার ৩১৭টি। ডাকাতির মামলা ১ হাজার ১৫৯টি থেকে কমে ১ হাজার ৭৭টি এবং অপহরণের মামলা ৬২৮টি থেকে কমে ৬১৮টি হয়েছে। বিপরীতে চুরির মামলা ১ হাজার ৭৯৬টি থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩২টিতে দাঁড়িয়েছে।
এ সময়ে মোট নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজার ২৯৬ থেকে বেড়ে ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৬৩ হয়েছে, অর্থাৎ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। এ বৃদ্ধিতে মাদকসংক্রান্ত মামলার বড় ভূমিকা রয়েছে। তবে শুধু মামলার সংখ্যা দিয়ে মাদক অপরাধ বেড়েছে, নাকি মামলা নথিভুক্তের হার বেড়েছে, তা নিশ্চিত করা যায় না।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত গণপিটুনিতে ১৩১ জন নিহত হয়েছেন।
গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। তাঁর দরগায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও হামলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন।
সেপ্টেম্বরে ঢাকায়ও দলবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটে। ২৫ সেপ্টেম্বর মিরপুরের মা ও শিশুস্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে দুই শতাধিক মুখোশধারী হামলাকারী ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরদিন কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জমি নিয়ে বিরোধকে হামলার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। গত জুনে সাভারে উত্তেজিত জনতা দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করে এক আসামিকে ছিনিয়ে নেয়। জুলাইয়ে কুতুবদিয়ায় এক আসামিকে হেফাজতে নেওয়ার সময় তিন পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা হয়। ৫ সেপ্টেম্বর সাভারে স্পেশাল ব্রাঞ্চের উপপরিদর্শক আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১০ অক্টোবর খুলনায় ছিনতাইকারীদের হামলায় এক পুলিশ পরিদর্শক গুরুতর আহত হন।
সরকারের দাবি, পুলিশ বাহিনী ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। গত ২৬ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে দায়ের হওয়া প্রায় সব ফৌজদারি মামলার আসামিকে যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পেয়েছিল এবং পুলিশ বাহিনীর মনোবল ফেরাতে কাজ করছে।
চাঁদাবাজিও উদ্বেগের বিষয় হিসেবে রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত আদালতের নথির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা মহানগরের ৪৯টি থানায় ৭২৩টি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আগের সময়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. মো. তৌহিদুল হক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতাকে মিশ্র হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, গত দেড় বছরের তুলনায় পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি, আবার নাটকীয় অবনতিও ঘটেছে—এমনটি বলা যায় না।
তৌহিদুল হক মনে করেন, আইনের অসম প্রয়োগ এবং নিজ দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির পথে বাধা। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ভেতরের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন।
মাদকবিরোধী অভিযান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই বিশ্লেষক। তাঁর বক্তব্য, মাদকসেবী, খুচরা বিক্রেতা ও বাহকেরা গ্রেপ্তার হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রাজনৈতিক সুরক্ষা পেয়ে যাচ্ছেন। মাদক ব্যবসার মূল পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ বাহিনীতে আরও গভীর পরিবর্তন প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
অর্থনীতিতে স্বস্তি সীমিত
বিএনপি সরকারের প্রথম কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি। চলতি বছরের মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। মে মাসে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছায়। সেপ্টেম্বরে কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে, যা ২০২৫ সালের একই মাসের ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশের চেয়ে সামান্য কম।
অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার কমলেও পণ্যের দাম আগের তুলনায় বেশি থাকায় সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর ব্যয়ের চাপ অব্যাহত রয়েছে।
আগস্টে মজুরি সূচক বেড়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা ওই মাসের মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় কম। কৃষি, নির্মাণ ও পরিবহন খাতের শ্রমিকদের মতো নির্বাচিত পেশার মজুরি নিয়ে এ সূচক তৈরি করা হয়। ফলে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে মজুরি বাড়লেও ক্রয়ক্ষমতা পুরোপুরি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে প্রবাসী আয় কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে ১৮ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে সহায়তা করেছে। তবে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির প্রবণতা বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই শুরু হয়েছিল।
ব্যবসায়িক খাতেও এখনো সতর্কতা রয়েছে। ব্যাংক নির্বাহীরা দুর্বল বাজারচাহিদা, ঋণের উচ্চ সুদহার ও জ্বালানি সংকটকে বিনিয়োগের পথে বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেনের মতে, অনেক কারখানা এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। ফলে নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণে বিনিয়োগের আগ্রহও সীমিত।
সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে দুর্বল ঋণব্যবস্থা ও খেলাপি ঋণের চাপ পেয়েছে। ঋণ বিতরণের সক্ষমতা সংকুচিত থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহব্যবস্থার সমস্যাজনিত মূল্যস্ফীতি শুধু সুদের হার বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এদিকে শিল্প, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন প্যাকেজও ঘোষণা করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সেপ্টেম্বরে সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান কমাতে এ সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয় ছিল। তবে এতে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করতে পারে।
রাজস্ব আদায়েও চাপ রয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯ দশমিক ৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নে সরকার প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৫৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। দুই মাসের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়, ভর্তুকি, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং বড় প্রকল্পের ব্যয় সরকারের আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে।
শিল্প অর্থনীতিবিদ ও নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, স্থবির প্রবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব অর্থনীতির মন্থরতার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর অভিযোগ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারে সরকার যথেষ্ট আগ্রহ দেখায়নি। সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো রাজস্ব সক্ষমতাও সীমিত।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি ও বড় প্রকল্পের সময় নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ২৫টি বোয়িং ও ১০টি এয়ারবাসসহ মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান না বাড়িয়ে বড় আকারের কেনাকাটা করা হলে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন এই অর্থনীতিবিদ।
তাঁর মতে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ পরিবার যখন আর্থিক চাপে রয়েছে, তখন সরকারের নতুন ব্যয় পরিস্থিতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চড়া সুদ ও অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিবেশ বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে।
তবে গোলাম মোয়াজ্জেম স্বীকার করেন, বিএনপি সরকার অনেক সমস্যাই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিকে দীর্ঘদিন অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। অর্থনৈতিক পতন ঠেকানো ও পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই সরকার ক্ষমতায় এসেছে বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
পররাষ্ট্রনীতিতে অগ্রগতি ও জটিলতা
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান চীন, মালয়েশিয়া ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সফর করেছেন। তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এখনো জটিলতা রয়ে গেছে। ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তাঁকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার দাবির কারণে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত ৩ অক্টোবর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি তিনি।
ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে যোগ দিতেও অস্বীকৃতি জানান তারেক রহমান। বাংলাদেশের আপত্তি ছিল, তাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ভারত অবশ্য জানিয়েছিল, দ্বিপক্ষীয় সফরসহ পৃথক আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছিল।
বাংলাদেশের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার ও পানি বণ্টন নিয়ে অগ্রগতি। বিশেষ করে ডিসেম্বরে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকায় বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে অগ্রগতি হয়েছে। জুনে তারেক রহমানের চীন সফরে বেইজিং মোংলা বন্দর, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে সহায়তার অঙ্গীকার করে। দুই দেশ পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সংলাপের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করতে সম্মত হয়।
তিস্তা প্রকল্পে চীনের কারিগরি সহায়তা বাড়ানো এবং দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রতিশ্রুতি এলেও চূড়ান্ত অর্থায়ন চুক্তি হয়নি। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানি বণ্টনসংক্রান্ত বিরোধের সমাধান আলাদাভাবে প্রয়োজন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারেও সরকার বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সফরকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার দেয়। এর ফলে চলতি বছরে বোয়িংয়ের কাছে বিমানের মোট অর্ডারের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫টি। বহর আধুনিকায়নের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমানোও এ উদ্যোগের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক চুক্তি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের দুই দিন আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ১৯ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল আমদানির শর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাকে বিশেষ সুবিধার বিধান রাখা হয়। চুক্তিতে মার্কিন কৃষিপণ্য ও জ্বালানি কেনার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তারেক রহমান রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানান। মিয়ানমারে তাঁদের অধিকার রক্ষা, মানবিক সহায়তার নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন এবং নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা মানুষের পরিস্থিতিও তুলে ধরেন তিনি।
একই সফরে প্রধানমন্ত্রী কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা চান। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির মধ্যে বাজারসুবিধা অব্যাহত রাখা, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।
অক্টোবর ও নভেম্বরে জাপান ও সৌদি আরব সফরের সূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এ ছাড়া জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এ যোগ দিতে তুরস্ক সফরের কথাও রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিবেশ ও বাকস্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
সরকারের প্রথম কয়েক মাসেই বিএনপি ও একসময়ের রাজনৈতিক সহযোগীদের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। সংসদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও জননিরাপত্তা নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছে। এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে না দেওয়ার প্রবণতা সরকারের জবাবদিহি ও নজরদারির সুযোগ সীমিত করছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা নিষেধাজ্ঞা বিএনপি সরকারও বহাল রেখেছে। নিষেধাজ্ঞাটি রাজনৈতিক সমাবেশের পাশাপাশি প্রকাশনা ও ডিজিটাল প্রচারণার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফলে দলটির সমর্থকেরা নিজেদের রাজনৈতিক ব্যানারে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও আইনি হয়রানির ঘটনাও উদ্বেগের কারণ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাংবাদিকদের হয়রানির ২৪২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার সবগুলোর জন্য সরাসরি সরকারকে দায়ী করা না গেলেও নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সাংবাদিকদের পেশাগত ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের আটক ও কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্ত শত শত ব্যক্তি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই কারাবন্দী রয়েছেন। সংস্থাটির দাবি, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তত ১০ জন আওয়ামী লীগ নেতার কারাগারে মৃত্যু হয়েছে; তাঁদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বন্দীদের পরিবার ও আইনজীবীদের অভিযোগ, যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না এবং জামিনের পর নতুন মামলা দিয়ে তাঁদের মুক্তি আটকে রাখা হচ্ছে। সাবেক কর্মকর্তাদের কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকার বিষয়টি স্বীকার করেও এইচআরডব্লিউ প্রতিটি আটকের পর্যালোচনা এবং কারাগারে মৃত্যুর স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
প্রস্তাবিত সাইবার আইনের পরিবর্তন নিয়েও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) সেপ্টেম্বরে সতর্ক করে বলেছে, প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় ‘গুজব’ বা ‘অপতথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগে সাংবাদিকদের ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। আদালত বা প্রশাসনের বক্তব্যের সঙ্গে অমিল এমন প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ঝুঁকিও তুলে ধরেছে সংগঠনটি।
সরকারের বক্তব্য, সংশোধনীগুলো সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে করা হয়নি। তবে সম্পাদক ও সংবাদমাধ্যমের সংগঠনগুলোর আপত্তির পর সেপ্টেম্বরে সুরক্ষার বিষয়ে সুপারিশ দিতে দুটি কমিটি গঠনে সম্মত হয় সরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ এম শাহান মনে করেন, সাইবার আইনের পরিবর্তন এবং মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থার দুর্বলতা সমালোচকদের দমনে সরকারের ক্ষমতা বাড়াতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, কিছু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিরোধী দল ও ভিন্নমতকে দুর্বল করতে ব্যবহৃত হতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, সরকারের কর্মকাণ্ডের চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য আট মাস খুব কম সময়। তবে তিনি কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক উদ্যোগও দেখছেন। একই সঙ্গে কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, পুলিশি হেফাজত ও কারাগারে মৃত্যু, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং গণপিটুনিকে বড় উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কার্যালয়ে হামলার অভিযোগও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। জাসদের দাবি, পূর্বনির্ধারিত সভা চলাকালে বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত লোকজনের ওপর হামলা চালান এবং পরে পুলিশ অনেককে আটক করে। পুলিশ জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেখানে জড়ো হয়েছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়েছিল। জাসদ এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে, আর যুবদলের এক নেতা মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নূর খান লিটন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুমসংক্রান্ত আইনের পরিবর্তন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, নতুন আইনগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে কমিশনের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও প্রস্তাবিত সাইবার আইনের প্রভাব নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এখনো আলোচনায়
গত ফেব্রুয়ারির গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার এখনো বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে। প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা নির্ধারণ, সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে সংসদীয় কমিটি কাজ করছে। তবে প্রতিবেদন তৈরি বা সংশোধনী বিল উপস্থাপনের নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি তিনি।
নির্বাচনের পর ‘জুলাই চার্টার’ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। বাস্তবায়ন আদেশে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পৃথক সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল হিসেবে কাজ করার কথা বলা হয়েছিল। প্রথম বৈঠকের পর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কার সম্পন্ন করার প্রস্তাবও ছিল।
তবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা কাউন্সিলের শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁদের যুক্তি, বিদ্যমান সংবিধান অনুসরণ করেই পরিবর্তন আনা উচিত। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা উভয় শপথ নিয়ে বলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার কাউন্সিলের মাধ্যমেই প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করতে হবে।
পরবর্তী সময়ে সরকার জুলাই মাসে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করে, যেখানে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ রাখা হয়। তবে বিরোধী দলগুলো কমিটিতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সংস্কারের বিষয়বস্তু নির্ধারণ নিয়েও মতবিরোধ দেখা দেয়। বিএনপির বক্তব্য, জুলাই চার্টারে স্বাক্ষরের সময় যেসব বিষয়ে তারা আপত্তি জানিয়েছিল, সেগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। বিরোধীদের দাবি, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কার বাস্তবায়নের অনুমোদন দিয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বিরোধী দলগুলো আলোচনায় যোগ দিলে আপত্তির বিষয়ে সমঝোতার সুযোগ রয়েছে। একই ব্যক্তি টানা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে না পারার প্রস্তাবেও তিনি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
দীর্ঘ ১৬৮ দিন পদ খালি থাকার পর গত আগস্টে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে স্থবির তদন্ত ও অভিযোগের কাজ পুনরায় শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে নিয়োগগুলো পুরোনো আইন অনুসারেই হওয়ায় স্বাধীন নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি বলে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের ‘রিফর্ম ওয়াচ’ উল্লেখ করেছে।
সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুমসংক্রান্ত আইন পাস হয়। গুমবিরোধী আইনে অপরাধীদের বিচার, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব স্বাধীন কমিশনের বদলে সরকারের মনোনীত অন্য কোনো বাহিনীর হাতে ন্যস্ত করার সমালোচনা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর মতে, নতুন ব্যবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চালু করা কিছু সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে কমিশনের স্বাধীনতা এবং কমিশনের সদস্য নিয়োগে সরকারের প্রভাব নিয়েও সংস্থাটি উদ্বেগ জানিয়েছে।
র্যাব পুনর্গঠন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া নতুন আইনে র্যাব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ গঠন করা হয়। আগের বাহিনীর সদস্য, ক্ষমতা ও সম্পত্তি নতুন বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। তবে স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই বলে এইচআরডব্লিউর সমালোচনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ এম শাহানের মতে, নির্বাচন আয়োজন গণতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ মাত্র। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়াও জরুরি। তাঁর ভাষ্য, সরকার কীভাবে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চায়, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেখা যাচ্ছে না।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বিএনপি রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বেছে বেছে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারে। বিচার বিভাগকে সরকারের ওপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করতে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক প্রশাসনিক সচিবালয় গঠনের প্রস্তাবের উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবটির বিরোধিতা না করলেও বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে তাঁর মন্তব্য।
সব মিলিয়ে, বিএনপি সরকারের আট মাসের চিত্রে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির হারে সামান্য হ্রাস এবং কিছু প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা, বিনিয়োগ, নাগরিক স্বাধীনতা ও কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সরকার এসব ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি আনতে পারে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনে গৃহীত নীতি, বাস্তবায়নের গতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।
সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনূদিত প্রতিবেদন।
এমকে/বিএম২৪









