ঋণ পরিশোধে রাজস্বের ১৪ শতাংশ ব্যয়, সহজ শর্তে ঋণ বাড়াতে চায় আইএমএফ

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২১ পিএম
ঋণ পরিশোধে রাজস্বের ১৪ শতাংশ ব্যয়, সহজ শর্তে ঋণ বাড়াতে চায় আইএমএফ

সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের চাপে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে। এসব দেশের রাজস্ব আয়ের যে অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়, তা কয়েক বছরের ব্যবধানে ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ঋণ পুনর্গঠন দ্রুত ও কার্যকর করার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।


শনিবার (১৭ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনের ষষ্ঠ দিনের সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এতে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান উপস্থিত ছিলেন। ব্রিফিং সঞ্চালনা করেন আইএমএফের যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক জুলি কোজাক।


ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ন্যায্য রাজস্বনীতি গ্রহণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) নতুন প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগানো এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।


দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব তুলে ধরে আইএমএফপ্রধান বলেন, মূল্যস্ফীতি অনেকটা করের মতো, যার সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে দরিদ্র মানুষের ওপর। মানুষ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি চায়। তারা সরকারের কাছ থেকে সুস্পষ্ট নীতি এবং এমন পরিবেশ প্রত্যাশা করে, যেখানে বেসরকারি খাত ও উদ্যোক্তারা সহজে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবেন।


তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংকট ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে নিম্ন আয়ের দেশগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব দেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।


সহজ শর্তে ঋণ বাড়ানোর উদ্যোগ


নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে আইএমএফ কাজ করছে বলে জানান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি বলেন, দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা তহবিলের (পিআরজিটি) জন্য সদস্যদেশগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত সহায়তা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ তহবিলের আওতায় যোগ্য দেশগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হয়।


তিনি আরও জানান, নতুন সংস্কারের ফলে আগের তুলনায় সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্যও অতিরিক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে।


নিম্ন আয়ের দেশগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জর্জিয়েভা বলেন, এসব দেশের অনেককেই বড় ধরনের ব্যয় সংকোচন বা কঠোর অর্থনৈতিক সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে—এমন ধারণার কারণ নেই। গত কয়েক বছরে অনেক দেশ অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করা এবং ঋণের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি অর্জন করেছে।


তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ আয়ের দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় ঋণের অনুপাত বাড়ছে। বিপরীতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ অনুপাত কিছুটা কমছে।


তবে ঋণের অনুপাত কমলেও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর আর্থিক চাপ পুরোপুরি কাটেনি। মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ঋণের অনুপাত কমার পরও উচ্চ সুদের কারণে রাজস্ব আয়ের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে।


ঋণ পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার তাগিদ


ঋণসংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, যেসব দেশের ঋণ পুনর্গঠন প্রয়োজন, সেগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জি-২০-এর কমন ফ্রেমওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন।


জর্জিয়েভা বলেন, কিছু দেশের ঋণ দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হলেও তাৎক্ষণিক অর্থের ঘাটতি রয়েছে। এসব দেশকে নিজস্ব রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সহায়তা করতে হবে। একই সঙ্গে সমন্বিত আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করে বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন।


তিনি আরও বলেন, সরকার, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীরা নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারলে তার সুফল সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিফলিত হবে।


এমকে/বিএম২৪