মাদকের অভয়ারণ্য পীরগাছা: ভাঙতে হবে নেপথ্যের সিন্ডিকেট

প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
মাদকের অভয়ারণ্য পীরগাছা: ভাঙতে হবে নেপথ্যের সিন্ডিকেট

রংপুরের পীরগাছা উপজেলা আজ এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি। তিস্তা নদী ও চরাঞ্চলকে ঘিরে যে জনপদ গড়ে উঠেছিল, আজ তা মাদক চোরাচালানের নিরাপদ ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য এবং সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই অপরাধচক্র কেবল সক্রিয়ই নয়, বরং তা স্থানীয় তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অশনিসংকেত।

ভারতের সীমান্ত লাগোয়া লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে মাদকের বড় বড় চালান পীরগাছায় প্রবেশ করছে। বিশেষ করে ৫নং ছাওলা ইউনিয়নের পাওটানাহাট বাজার থেকে শিবদেব বোল্ডারের মাথা পর্যন্ত এলাকাটি মাদক ব্যবসায়ীদের প্রধান করিডোর হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোরাকারবারিরা ‘আলীবাবা থিম পার্ক’ সংলগ্ন সড়ক কিংবা পাওটানাহাট সড়ককে সরবরাহের রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিতে তারা অবলম্বন করছে নিত্যনতুন কৌশল—কখনও কাপড় বা ফলের ভ্যান, আবার কখনও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে হোম ডেলিভারি পদ্ধতিতে মাদক কেনাবেচা চলছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, গত দুই বছরে বেশ কিছু অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এপ্রিল ২০২৪-এ পূর্বদেবু এলাকায় ৩৫ কেজি গাঁজাসহ ৪ জন, ডিসেম্বর ২০২৫-এ চন্ডিপুর বাজারে ইয়াবা-গাঁজাসহ দুই কারবারি, এবং মে ২০২৬-এর অভিযানে ইটাকুমারীতে দেড় কেজি গাঁজা, পীরগাছা ইউনিয়নে ১০ পিস ইয়াবা ও তাম্বুলপুরে ৮ পুরিয়া হেরোইনসহ বেশ কয়েকজন কারবারিকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ছাওলা ইউনিয়নের বোল্ডারের মাথা এলাকা থেকে ৮ কেজি গাঁজাসহ কারবারিদের গ্রেপ্তারের রেকর্ড রয়েছে। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, বারবার গ্রেপ্তার সত্ত্বেও এই কারবার কেন থামছে না? কেনই বা নিম্ন মাধ্যমিক পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এই অন্ধকার পথে পা বাড়াচ্ছে?

অভিযোগ রয়েছে, এই চোরাচালান চক্রের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহলের নীরব বা প্রত্যক্ষ মদদ। সাধারণ খুচরা বিক্রেতা বা ক্যারিয়াররা আইনের আওতায় এলেও মূল হোতারা প্রায়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। যখন সাধারণ মানুষ দেখে মাদকের কারবারিরা প্রকাশ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন তাদের মনে চরম হতাশা তৈরি হয়।

পীরগাছার এই সংকট নিরসনে প্রশাসন ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো জরুরি:

১. সিন্ডিকেট নির্মূল: কেবল খুচরা বিক্রেতা নয়, মাদকের নেপথ্যের রাঘব বোয়ালদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

২. নদীপথে নজরদারি:তিস্তা নদী ও চরাঞ্চলকে মাদক কারবারিদের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার রোধে নির্দিষ্ট পয়েন্টে স্থায়ী টহল চৌকি স্থাপন করতে হবে।

৩. সামাজিক সুরক্ষা:শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোর মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে হবে।

পীরগাছার মাটি আমাদের—এই মাটি যেন কোনো অপরাধী চক্রের নিরাপদ অভয়ারণ্য না হয়। আমরা চাই, আমাদের এই এলাকা মাদকের বিষবাষ্প থেকে মুক্ত হয়ে মেধা ও সৃজনশীলতায় এগিয়ে যাক। প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে এলাকাকে নিরাপদ করা হোক।

লেখক:

মো. মাহমুদুল হাসান

 ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা কলেজ