গ্লোবাল মার্কেটপ্লেসে লাল-সবুজের জয়জয়কার: ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপ বিপ্লবে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের গল্প

প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম
গ্লোবাল মার্কেটপ্লেসে লাল-সবুজের জয়জয়কার: ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপ বিপ্লবে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের গল্প

চাকরির পেছনে ছুটে জুতো ক্ষয় করার সনাতনী মানসিকতা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে বাংলাদেশের আজকের তরুণ সমাজ। চাকরি না খুঁজে নিজেই কর্মসংস্থান তৈরি করা কিংবা নিজের মেধা দিয়ে বিশ্বজয় করার নতুন যুগের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে দেশের যুবসমাজ এখন এক নীরব অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছে। গত কয়েক বছরে দেশে দ্রুতগতির ইন্টারনেট অবকাঠামোর উন্নয়ন, দেশব্যাপী ফাইবার অপটিক ক্যাবলের সম্প্রসারণ এবং স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা কোটি তরুণকে গ্লোবাল মার্কেটপ্লেসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আজ ঢাকার অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে কুড়িগ্রাম কিংবা বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন তরুণও ঘরে বসে ডেক্সটপ বা ল্যাপটপে ক্লিক করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় কোম্পানির কাজ করে দিচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের এক নতুন ও শক্তিশালী জোয়ার সৃষ্টি করেছে।

বিশ্বের ফ্রিল্যান্সিং বাজারে বাংলাদেশ এখন আর কোনো নতুন বা অনভিজ্ঞ নাম নয়, বরং এটি অন্যতম এক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অনলাইন শ্রম সরবরাহে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। একসময় এদেশের ফ্রিল্যান্সাররা মূলত ডাটা এন্ট্রি, সাধারণ এসইও কিংবা বেসিক অ্যাডমিন সাপোর্টের মতো কম আয়ের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজকের তরুণরা নিজেদের দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে। তারা এখন সাফল্যের সাথে অ্যাডভান্সড সফটওয়্যার ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের কাজ করছে এবং বিশ্বমানের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার তৈরিতে বাঙালি কোডারদের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডাটা সায়েন্স, এআই মডেল ট্রেইনিং, ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং মেশিন লার্নিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তির কাজগুলো এখন এদেশের তরুণরা ঘরে বসেই দক্ষতার সাথে সাবকন্ট্রাক্টে করছে। গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলোর ওয়েবসাইট ও অ্যাপের ইউজার ইন্টারফেস ডিজাইন, থ্রিডি গেম মডেলিং, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং বৈশ্বিক বাজারের জন্য কনটেন্ট স্টোরি তৈরি করার কাজও এখন দাপটের সাথে করছেন এদেশের দক্ষ ফ্রিল্যান্সাররা।

এই বিপ্লবের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো এর বিকেন্দ্রীকরণ। ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য এখন আর কাউকে গ্রাম ছেড়ে ঢাকা বা বড় কোনো বিভাগীয় শহরে এসে মেস লাইভ কাটাতে হচ্ছে না। ইউনিয়ন পর্যায়ের ডিজিটাল সেন্টার এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের কল্যাণে প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণরাও আজ স্বাবলম্বী হচ্ছে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ছে, যা গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে বড় ভূমিকা রাখছে। একই সাথে, এই খাতটি বাংলাদেশের নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করছে। আমাদের সমাজে অনেক যোগ্য ও উচ্চশিক্ষিত নারী বিয়ের পর কিংবা পারিবারিক দায়িত্বের কারণে ঘরের বাইরে গিয়ে প্রথাগত চাকরি করতে পারেন না। ফ্রিল্যান্সিং তাঁদের জন্য এনে দিয়েছে এক সোনালী সুযোগ। ঘর ও সংসারের সমস্ত দায়িত্ব সামলে, নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে কম্পিউটারের সামনে বসে হাজার হাজার নারী এখন প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করছেন, যা পরিবারে তাঁদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সমাজে তাঁদের আত্মমর্যাদা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত পুঁজি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের ভেতরেই এখন গড়ে উঠছে নতুন নতুন উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক উদ্যোগ বা স্টার্টআপ। রাইড শেয়ারিং অ্যাপ, ফুড ডেলিভারি নেটওয়ার্ক, অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর প্রযুক্তি—সবখানেই তরুণদের তৈরি স্টার্টআপগুলো দাপট দেখাচ্ছে। এই দেশীয় কোম্পানিগুলো শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সহজ ও আধুনিক করেনি, বরং প্রথাগত চাকরির বাজারের বাইরে গিয়ে লক্ষাধিক ডেলিভারি রাইডার ও টেকনিক্যাল পারসনের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুর ও জাপানের বড় বড় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরাও এখন বাংলাদেশের এই উদীয়মান স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে কোটি কোটি ডলার পুঁজি বিনিয়োগ করতে গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

তরুণদের এই অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে রাষ্ট্রও পিছন থেকে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার রূপকল্পের অধীনে সরকার ফ্রিল্যান্সিং খাতকে সর্বাত্মক সহায়তা দিচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে অর্জিত আয়ের ওপর সরকার কর মওকুফ সুবিধা বা ট্যাক্স হলিডে প্রদান করছে, যা তরুণদের এই পেশায় আসতে দারুণভাবে উৎসাহিত করছে। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিংয়ের রেমিট্যান্স দেশে আনলে সরকার তার ওপর নির্দিষ্ট হারে সরাসরি নগদ আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় হাই-টেক পার্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে তরুণ-তরুণীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অ্যাডভান্সড কোডিং, গ্রাফিক্স এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ফ্রিল্যান্সারদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে সরকার বিশেষ আইডি Cards এর ব্যবস্থা করেছে, যা ব্যবহার করে তারা ব্যাংকিং লোন বা ক্রেডিট কার্ডের মতো সুবিধা সহজে পেতে পারেন।

বিপুলের এই সম্ভাবনা এবং সাফল্যের গল্পের আড়ালে কিছু বাস্তব ও নির্মম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিও প্রতিনিয়ত হতে হচ্ছে আমাদের ফ্রিল্যান্সারদের। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পেমেন্ট গেটওয়ে পেপ্যাল সরাসরি বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না থাকায় আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে দ্রুত ও সহজে টাকা তুলতে ফ্রিল্যান্সারদের এখনো বিভিন্ন বিকল্প ও জটিল পথের আশ্রয় নিতে হয়, যা অনেক সময় বাড়তি খরচের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকা বা বড় শহরের বাইরে এখনো মাঝে মাঝে ঘনঘন লোডশেডিং এবং ইন্টারনেটের আকস্মিক ধীরগতির কারণে ক্লায়েন্টের ডেডলাইন মিস করতে হয় অনেককে। আন্তর্জাতিক বাজারে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সময়ানুবর্তিতা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় এটি দেশের ভাবমূর্তির ক্ষতি করে। এছাড়া সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রথাগত ব্যাংক এখনো ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের উৎস বুঝতে না পেরে ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করতে বা নতুন উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ দিতে নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করে।

সমস্ত বাধা, লোডশেডিং আর পেমেন্ট গেটওয়ের সীমাবদ্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাংলাদেশের এই তরুণ প্রজন্ম কেবল নিজেদের মেধা, ধৈর্য আর ইচ্ছাশক্তিকে সম্বল করে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে চলেছে। তারা প্রমাণ করেছে যে, যথাযথ সুযোগ আর সামান্য টেকনিক্যাল সাপোর্ট পেলে বাঙালি তরুণরা পৃথিবীর যেকোনো উন্নত দেশের মেধার সাথে সমানে সমানে টক্কর দিতে পারে। এই মানবসম্পদই বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনীতির আসল মেরুদণ্ড। এই তরুণদের সমস্যার সমাধান করে তাঁদের পথকে মসৃণ করে দিলে, বাংলাদেশ খুব দ্রুতই বিশ্বের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখা:

সুমাইয়া ইসলাম সিহা 

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।