জিনি কোফিশিয়েন্টের ঊর্ধ্বগতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ: কেন এদেশে সামাজিক গণতন্ত্র দরকার

প্রকাশিত: ০৯ জুলাই ২০২৬, ১১:২৯ পিএম
জিনি কোফিশিয়েন্টের ঊর্ধ্বগতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ: কেন এদেশে সামাজিক গণতন্ত্র দরকার

একটি দেশের উন্নয়ন কেবল কত দ্রুত তার অর্থনীতি সম্প্রসারিত হচ্ছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়। অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি আয় ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত না হলে প্রবৃদ্ধি একসময় বৈষম্য, সামাজিক অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। এই বাস্তবতাকে পরিমাপ করার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক সূচক হলো "জিনি কোফিশিয়েন্ট"।

জিনি কোফিশিয়েন্টের মান ০ থেকে ১-এর মধ্যে নির্ধারিত হয়। মান যত শূন্যের কাছাকাছি থাকে, আয়ের বণ্টন তত সমতাভিত্তিক; আর মান যত ১-এর দিকে অগ্রসর হয়, বৈষম্য তত তীব্র হয়। অর্থনীতিবিদদের কাছে এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং একটি দেশের সামাজিক ন্যায়বিচার, সুযোগের সমতা এবং রাষ্ট্রের পুনর্বণ্টন নীতির কার্যকারিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

বাংলাদেশের গৃহস্থালি আয়-ব্যয় জরিপ (HIES ২০২২) অনুযায়ী জাতীয় জিনি কোফিশিয়েন্ট ০.৪৯৯, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ের অন্যতম। একই জরিপে দেখা যায়, দেশের সর্বোচ্চ আয়কারী ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠী জাতীয় আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ ভোগ করে, অথচ সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ মানুষের অংশ মাত্র ১.৩১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। উন্নয়নের ফল ক্রমেই সীমিত একটি শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই. স্টিগলিটজ তাঁর The Price of Inequality গ্রন্থে দেখিয়েছেন, অতিরিক্ত বৈষম্য কেবল দরিদ্র মানুষের ক্ষতি করে না; এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও দুর্বল করে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষয় করে এবং সামাজিক আস্থাকে ভেঙে দেয়। অন্যদিকে ফরাসি অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি তাঁর বহুল আলোচিত Capital in the Twenty-First Century গ্রন্থে যুক্তি দেন, রাষ্ট্র যদি কার্যকর পুনর্বণ্টনমূলক নীতি গ্রহণ না করে, তাহলে সম্পদ স্বাভাবিকভাবেই ক্রমে অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং বৈষম্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থায়ী রূপ লাভ করে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাও এই গবেষণাগুলোর সঙ্গে আশঙ্কাজনকভাবে সঙ্গতিপূর্ণ। আয় বৈষম্য বাড়ার অর্থ কেবল ধনী আরও ধনী হওয়া নয়; এর অর্থ দরিদ্র মানুষের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ বাসস্থান এবং দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়া। ফলে সামাজিক গতিশীলতা কমে যায় এবং জন্মগত বৈষম্য ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক বৈষম্যে রূপ নেয়।

আয় ও সম্পদের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যও নষ্ট করে। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী গোষ্ঠী নীতিনির্ধারণে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যার ফলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। এভাবে বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যেও রূপান্তরিত হয়। ফলাফল হিসেবে মধ্যবিত্ত শ্রেণি দুর্বল হয়, সামাজিক অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়, দুর্নীতি ও অপরাধের ঝুঁকি বাড়ে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও চাপের মুখে পড়ে।

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং OECD–এর বিভিন্ন গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে, অতিরিক্ত আয় বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে। অর্থাৎ বৈষম্য কমানো কেবল সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; এটি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও পূর্বশর্ত।

এই বাস্তবতায় সামাজিক গণতন্ত্র বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত নীতিগত কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সামাজিক গণতন্ত্র বাজার অর্থনীতিকে অস্বীকার করে না; বরং বাজারের সৃজনশীল শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের মাধ্যমে ন্যায্য পুনর্বণ্টন নিশ্চিত করতে চায়। ব্যক্তিগত মালিকানা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার বজায় রেখেও একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠন সম্ভব- নর্ডিক দেশগুলোর অভিজ্ঞতা তারই প্রমাণ।

নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডে প্রগতিশীল করব্যবস্থা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, বিনামূল্যে বা স্বল্পব্যয়ে মানসম্মত শিক্ষা, শক্তিশালী শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং বিস্তৃত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে বাজারে সৃষ্ট বৈষম্যের বড় অংশ রাষ্ট্র পুনর্বণ্টন করে। ফলে কর ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার পর এসব দেশের জিনি কোফিশিয়েন্ট সাধারণত ০.২৫ থেকে ০.২৯-এর মধ্যে অবস্থান করে, যা বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর অন্যতম।

বাংলাদেশেও আয় বৈষম্য কমাতে হলে প্রগতিশীল করব্যবস্থা কার্যকর করা, কর ফাঁকি ও অবৈধ সম্পদ সঞ্চয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি সম্প্রসারণ এবং সম্পদের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন রোধে কার্যকর নীতি গ্রহণ অপরিহার্য। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে পুনর্বণ্টনমূলক নীতির সুফল প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এখন প্রশ্ন শুধু কত শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলো, সেটি নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধির সুফল কতজন মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারল, সেটিই হওয়া উচিত উন্নয়নের মূল মানদণ্ড।

জিনি কোফিশিয়েন্টের বর্তমান ঊর্ধ্বগতি আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি সতর্কবার্তা। এই বার্তাকে উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও গভীর হবে, সামাজিক সংহতি দুর্বল হবে এবং উন্নয়নের ভিত্তিও ঝুঁকির মুখে পড়বে। কিন্তু যদি এখনই ন্যায্য পুনর্বণ্টন, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে আনা যায়, তবে বাংলাদেশ একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি কেবল পরিসংখ্যানে নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের জীবনমানের উন্নতিতে প্রতিফলিত হয়। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে সামাজিক গণতন্ত্র নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী ও পরীক্ষিত নীতিগত পথনির্দেশনা।

সালমান শরীফ 

প্রধান সংগঠক, জাতীয় ছাত্রমঞ্চ