সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের চাপে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ সদস্য

প্রকাশিত: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৫ পিএম
সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের চাপে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ সদস্য

প্রিন্স মন্ডল অলিফ, বাগেরহাট প্রতিনিধি:

দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে জেলে, বাওয়ালী ও বনজীবীদের মধ্যে আতঙ্কের নাম ছিল কথিত বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী। অবশেষে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক গোয়েন্দা তৎপরতা ও কঠোর অভিযানের মুখে বাহিনীটির তিন সক্রিয় সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছেন। একই সঙ্গে তাদের কবল থেকে একজন জিম্মি জেলেকেও উদ্ধার করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে মোংলায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন বাহিনীর সদস্য আল আমিন হোসেন, তৈবুর রহমান ও মনিরুজ্জামান ওরফে মামুন।

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের বিসিজিএস কামরুজ্জামান-এর নির্বাহী কর্মকর্তা কমান্ডার মো. মানসুরুন মাহ্‌দীন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের কাছ থেকে দুটি দেশীয় একনলা বন্দুক, একটি দেশীয় পাইপগান এবং ৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের হেফাজতে থাকা একজন জেলেকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে।

কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত গোয়েন্দা নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং দস্যুদের চলাচলের পথগুলোতে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর ফলে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রমাগত চাপ এবং নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে শেষ পর্যন্ত তারা আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আত্মসমর্পণকারী এই দস্যুরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরতে যাওয়া জেলে ও বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিল। বননির্ভর মানুষের অভিযোগ অনুযায়ী, তারা নদীপথে চলাচলকারী মাছ ধরার নৌকায় হামলা চালিয়ে জেলেদের অপহরণ করত এবং পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের আটকে রাখত।

স্থানীয় বনজীবীদের ভাষ্য, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ভয়ে অনেক জেলে ও বাওয়ালী নিরাপদে বনে প্রবেশ করতে পারতেন না। নিয়মিত চাঁদা আদায়, অস্ত্রের ভয় দেখানো এবং অপহরণের কারণে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। উদ্ধার হওয়া জিম্মি জেলের প্রাথমিক বক্তব্যেও জানা গেছে, অস্ত্রের মুখে তাকে গভীর বনের ভেতরে নিয়ে গিয়ে পরিবারের কাছে মুক্তিপণের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

কোস্ট গার্ড কর্মকর্তারা মনে করছেন, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাগাতার অভিযানের কারণে দস্যু চক্রটির কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে যাওয়ায় সদস্যরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছেন।

এ বিষয়ে কমান্ডার মো. মানসুরুন মাহ্‌দীন বলেন, সুন্দরবনে দস্যুতা নির্মূলের লক্ষ্যে পরিচালিত ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’-এর ইতিবাচক ফলাফল ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। দস্যু চক্রগুলোর নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে কোস্ট গার্ডের গোয়েন্দা শাখা নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।

তিনি আরও জানান, আত্মসমর্পণকারী তিনজনের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ২১ মে সুন্দরবনের আরেক দস্যু চক্র ছোট সুমন বাহিনীর সাত সদস্য কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ধারাবাহিক এসব আত্মসমর্পণ সুন্দরবনে দস্যু দমনে কোস্ট গার্ডের অভিযানের কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত করতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। যারা এখনও দস্যুতার সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সুন্দরবনে দস্যুতা কমে এলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন জেলে, বাওয়ালী ও বননির্ভর সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে পর্যটন, মৎস্য আহরণ এবং উপকূলীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে এ সফলতাকে স্থায়ী করতে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং দস্যু চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সুন্দরবনকে নিরাপদ ও দস্যুমুক্ত রাখতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের চলমান অভিযান ভবিষ্যতেও একই ধারায় অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।