হাসিনা বেগম বালিকা বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটি ঘিরে চাপ-ভয়ভীতির অভিযোগ

প্রকাশিত: ১৬ মে ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম
হাসিনা বেগম বালিকা বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটি ঘিরে চাপ-ভয়ভীতির অভিযোগ

বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি:

“আমাকে শুধু ফজলুল হকের সিভি রাখতে বলা হয়েছিল”—প্রধান শিক্ষক বিশেষ প্রতিনিধিঃ বাগেরহাটের চিতলমারী হাসিনা বেগম মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কমিটি গঠনে রাজনৈতিক চাপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সিভি বাছাইয়ে অনিয়ম এবং তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের আজীবন দাতা সদস্য ও সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এম. এম. নজরুল ইসলামের লিখিত অভিযোগ, প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য এবং উপজেলা প্রশাসনের প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে নানা পরস্পরবিরোধী তথ্য।

ইঞ্জিনিয়ার এম. এম. নজরুল ইসলাম তার লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, তিনি ২০২১ সালে বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মা হাসিনা বেগম বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা এবং তার বাবা ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও ভূমিদাতা। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন ও সুনাম রক্ষায় তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের অবদান রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

বর্তমান সরকার পুনরায় অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়ার পর তিনি সভাপতির পদে আবেদন করেন। কিন্তু একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে তাকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার অভিযোগ, ফজলুল হক, তার স্ত্রী রুনা গাজী ও ভাগিনা আবেদ শেখ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে শুধুমাত্র নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করতে চাপ প্রয়োগ করছেন।

অভিযোগে তিনি আরও উল্লেখ করেন, আবেদ শেখ অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিদ্যালয়টিকে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

গতকাল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শৈলেনর্দ্রনাথ বাড়ইয়ের কক্ষে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন আমাদের প্রতিনিধি। এ সময় কমিটি গঠনের জন্য জমা পড়া ৮টি সিভির মধ্যে কীভাবে বাকি ৫টি বাদ দেওয়া হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক বলেন,

“আমাকে শুধুমাত্র একটি সিভি রাখতে বলা হয়েছিল, আর সেটা হলো ফজলুল হকের। আমি শুধু তার সিভিটাই রেখেছি। পরে তার সঙ্গে কাদের রাখলে সুবিধা হবে, সেটাও তিনি নিজেই ঠিক করেছেন।”

প্রধান শিক্ষক আরও দাবি করেন, উপজেলার প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন বিএনপির নেতাকর্মী তার কক্ষে এসে তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। পরে বর্তমান চিতলমারী বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ৮ জন ব্যক্তি—যাদের নাম সংগত কারণে প্রকাশ করা হয়নি—তাকে বলেন,

“মল্লিক ফ্যামিলি হলো ফ্যাসিস্ট ফ্যামিলি, ওই পরিবারের কেউ স্কুলের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারবে না।”

এ সময় অভিযোগকারী ইঞ্জিনিয়ার এম. এম. নজরুল ইসলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কিনা জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেন,

“তা আমি জানি না।”

আলাপচারিতার একপর্যায়ে প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাকে মৌখিকভাবে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) রেফারেন্স দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, পরিবারকেন্দ্রিক না করে যোগ-বিয়োগ করে সিভি জমা দিতে। তবে পরে সবাই আবেদন প্রত্যাহার করায় তিনি সেটি করতে পারেননি বলে দাবি করেন।

তবে এ ঘটনায় নতুন মোড় নেয় এক সদস্যের বক্তব্যে। কমিটি থেকে নাম প্রত্যাহার করা এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনি গত ১২ মে মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তার আবেদন প্রত্যাহার করেন। কিন্তু তার অভিযোগ, আবেদন প্রত্যাহারের আগেই প্রধান শিক্ষক তিনটি সিভি ইউএনও’র কাছে জমা দিয়ে দেন।

তার ভাষ্য,

“এখানে প্রধান শিক্ষক হয় কারচুপি করেছেন, না হয় মিথ্যা কথা বলছেন।”

অন্যদিকে অভিযোগকারী ইঞ্জিনিয়ার এম. এম. নজরুল ইসলাম নিজেকে বিএনপির সক্রিয় কর্মী দাবি করেছেন। তিনি বলেন,

“আমি কখনো কোনোদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমি বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী। গত ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী পরিচালনার উপকমিটির একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করেছি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস আমার কাছে রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন,

“আমার মায়ের নামে এই স্কুল। আমার বাবা এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ভূমিদাতা ছিলেন। একটি কুচক্রী মহল বিদ্যালয়টি লুটেপুটে খাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।”

এ বিষয়ে চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,

“প্রধান শিক্ষক আমার কাছে এসেছিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছি, বাইরে থেকে কেউ চাপ বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করলে যেন আমাকে জানান। আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। কিন্তু প্রধান শিক্ষক আমাকে বলেছেন, বাহিরের কোনো চাপ নেই।”

ইউএনও আরও বলেন,

“ডিসি স্যারের মৌখিক বার্তাও আমি তাকে জানিয়েছি। প্রধান শিক্ষক আমাকে যে সিভিগুলো দিয়েছেন, আমি সেগুলো জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দিয়েছি মাত্র। এর বাইরে আমি আর কিছু জানি না।”

এদিকে বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে একের পর এক অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বক্তব্যে পুরো এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব, ভয়ভীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।