রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থানে বদলে যায় বাংলাদেশের ইতিহাস

প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪০ এএম
রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থানে বদলে যায় বাংলাদেশের ইতিহাস

সূত্রঃ ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর সেদিন দেশের ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। দুপুরের দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন ত্যাগ করেছেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানীজুড়ে হাজারো মানুষ রাজপথে নেমে আসে। পরে সেনাপ্রধানের জাতির উদ্দেশে ভাষণের ঘোষণা এবং ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিক হওয়ার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।


এই গণঅভ্যুত্থান কোনো একদিনের ঘটনা ছিল না। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিতর্কিত নির্বাচন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, গুম-খুন, দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক চাপ জনমনে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে তা বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়।


জুলাই মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে দাবি ছিল কোটা সংস্কার, তবে সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও দমন-পীড়নের অভিযোগের পর আন্দোলনের পরিধি বাড়তে থাকে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সংহতি প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে সরকারের পদত্যাগই আন্দোলনের প্রধান দাবিতে পরিণত হয়।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোটা ইস্যু ছিল আন্দোলনের সূচনা মাত্র; এর পেছনে বহুদিনের জমে থাকা অসন্তোষ কাজ করেছিল। ১৪ জুলাইয়ের পর আন্দোলন নতুন গতি পায়। পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষ, ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ এবং দেশজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও আন্দোলন থামেনি। বরং আন্তর্জাতিক মহলও বাংলাদেশের পরিস্থিতির দিকে নজর দেয় এবং সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানায়।


৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত বিশাল সমাবেশে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে এক দফা ঘোষণা আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর ‘মার্চ ফর ঢাকা’ কর্মসূচিকে ঘিরে সারা দেশ থেকে মানুষ রাজধানীমুখী হয়। নিরাপত্তা ব্যারিকেড অতিক্রম করে হাজারো মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করেন এবং ৫ আগস্ট সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জনসমাগম বাড়তে থাকে।


দুপুরের দিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর নিশ্চিত হলে রাজধানীতে উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে বিজয় মিছিলের পাশাপাশি কোথাও কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। পরবর্তী সময়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানান, নিরাপত্তাজনিত কারণে শেখ হাসিনা অল্প সময়ের নোটিশে ভারতে যান এবং মানবিক কারণে তাকে সাময়িকভাবে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়।


বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্ট শুধু একটি সরকারের পতনের দিন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পরিবর্তন ও সংস্কারের দাবিকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে। তাদের ভাষ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে এবং ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রেখে গেছে।



এমকে/বিএম২৪