মহাসড়কে ববি ছাত্রদলের লাখ টাকা চাঁদাবাজি

প্রকাশিত: ২০ মে ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
মহাসড়কে ববি ছাত্রদলের লাখ টাকা চাঁদাবাজি

ববি প্রতিনিধি:

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক ও ভোলা-বরিশাল মহাসড়কে বেড়েছে ছাত্রদলের একাংশের দৌরাত্ম্য। গভীর রাতে মাছের পোনাবাহী গাড়ি আটকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি ও মারধরের ঘটনায় পরিবহন শ্রমিক ও মাছের পোনা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার নাম ঘুরেফিরে সামনে আসছে।

তবে অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রদলের সদ্য ঘোষিত কমিটির শীর্ষ নেতারা এসব ঘটনায় জড়িত থাকায় দিনদিন মহাসড়কটিতে এ ঘটনা বেড়েই চলছে। 

জানা গেছে, মঙ্গলবার ( ১৯মে) ভোর সাড়ে ৫ টায় পটুয়াখালী থেকে আসা চিংড়ির রেনুবাহী একটি কালো রঙের হায়েস মাইক্রোবাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সংলগ্ন ঢাকা কুয়াকাটা মহাসড়কে থামিয়ে টাকা দাবি করে। চালক টাকা না দিয়ে দ্রুত গাড়িটি নিয়ে রুপাতলির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে।  এ সময় ঘটনাস্থলে একটি মোটরসাইকেল ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও একজন আহত হয়। পরে ঐ গাড়ির পিছু নেয় ববি ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। গাড়িটি রুপাতলী ট্রাফিক পুলিশ বক্সের কাছে পুলিশের টহল গাড়ির  সামনে এসে দাঁড়ালে ববির ৭/৮ জন শিক্ষার্থী পুলিশের সামনেই মাইক্রোবাসের চালক ও হেলপারকে মারতে থাকে। এতে ড্রাইভার ও হেল্পার মারাত্মক আহত হন।এ সময় তারা মাইক্রোবাসটির গ্লাস ও অন্যান্য অংশে ভাঙচুর করে। আহত শিক্ষার্থী ববির ১০ ব্যাচের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলকর্মী মো: আরাফাত।

এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি রাত ১১টার দিকে ভোলা-বরিশাল মহাসড়কের তালুকদার মার্কেট এলাকায় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মধ্যরাতে ভোলা-বরিশাল মহাসড়কে ইলিশ মাছের গাড়ি আটকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি ও ড্রাইভারকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। চাঁদাবাজির হাত থেকে রেহায় পেতে ৯৯৯ এ কল দিয়ে পুলিশের কাছে সহায়তা চেয়েছে ট্রাক চালক।

মাছের গাড়ি আটকে মহাসড়কে চাঁদাবাজির ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্য রয়েছে ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মিয়া বাবুল, সহ-সভাপতি মো. মিথুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. স্বজন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. ইমরান মাহমুদসহ একাধিক নেতাকর্মী এই চাঁদাবাজির সাথে যুক্ত রয়েছে। অভিযুক্ত এসব নেতাকর্মীদের ফোনে একাধিকবার কল দিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে ছাত্রদলে সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন ও সাংগাঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহামানের প্রশ্রয়ে মহাসড়কে এসব চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে।

আহত ছাত্রদলকর্মী আরাফাত বলেন, 'আমি ফজরের নামাজ পড়ে ভোর পাঁচটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঘুরতে গিয়েছিলাম এমন সময় পিছন থেকে এসে একটি হাইসগাড়ি আমার মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয় এতে আমি পড়ে গিয়ে আহত হই। আমি শেরে বাংলা মেডিকেলে সার্জারী বিভাগে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে এখন বাসায় আছি।'

সংশ্লিষ্ট মাছের মালিক ও গাড়ির ড্রাইভারদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাত ১২টার দিকে কুয়াকাটা থেকে চিংড়ির রেনু পোনা নিয়ে বরিশালের উদ্দেশ্য রওয়ানা করে দুটি গাড়ি। ভোর সাড়ে চারটার দিকে বরিশাল জিরোপয়েন্ট এলাকায় প্রথম গাড়িটি আটক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোলারোডে আটক করে ড্রাইভার ও হেল্পারকে মেরিন একাডেমির নির্মাণাধীন ভবনে আটকে চাঁদা দাবি করা হয়। মালিকপক্ষ থেকে এসময় ৯৯৯ এ কল দিয়ে বরিশাল বন্দর থানায় কল দিয়ে সাহায্য চেয়েও পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। বন্দর থানার পুলিশ বলেছে এটা নলসিটি থানার ভিতরে আর নলসিটি থানাপুলিশ বলে এটা বন্দর থানাধীন। পরবর্তীতে বিকাশ ও নগদে মিলিয়ে একলাখ টাকা দিয়ে গাড়ি উদ্ধার করেছেন।

পরবর্তীতে ভোর পাঁচটায় দ্বিতীয় গাড়িটি ধাওয়া করে। জিরোপয়েন্ট থেকে প্রথম গাড়ি আটকের খবর শুনে দ্বিতীয় গাড়িটি না থামিয়ে জোরে টান দেয়। এতে মোটরসাইকেল নিয়ে গাড়িটি ধাওয়া করলে ছাত্রদলকর্মী আরাফাতের মোটরসাইকেলে ধাক্কা লাগে এবং পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন। পরবর্তীতে মাছের গাড়ির ড্রাইভার ৯৯৯ এ কল দিয়ে পুলিশের সাহায্য চায় এবং রূপাতলি গাড়ি থামায়। গাড়ি থামানোর সাথেসাথে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা গাড়ি ভাংচুর করে ও ড্রাইভারকে মারধর করে পুলিশের উপস্থিতিতে। পুলিশ পরবর্তীতে থানায় গাড়ি নিয়ে আটকে রাখে। 

ভাংচুর হওয়া মাছবহনকারী মাইক্রোবাসের মালিক মো. মুহসিন বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আমার গাড়িটি আটকানোর চেষ্টা করে চাঁদাবজির জন্য। আগে থেকে তথ্য পেয়ে আমার গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি টান দেয় এতে ক্ষিপ্ত হয়ে গাড়িতে ইট মারে এতে গাড়ির সামনের গ্লাস ভেঙে যায়। পরবর্তীতে ধাওয়া করে রূপতলি এসে পুলিশ দেখে ড্রাইভার গাড়ি থামায় কিন্তু ওরা পুলিশের সামনে আমার গাড়ি ও ড্রাইভারকে মারধর করেছে বেদম। আমার গাড়ির প্রায় পাঁচলক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে। পরে থানায় পুলিশের উর্ধতন অফিসার ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের আলোচনার মাধ্যমে মাছের গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।"

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বলেন, আজকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে একটি মাইক্রোকার মেরে দেয়ায় সেটা নিয়ে মিমাংসার জন্য কোতোয়ালি মডেল থানায় গিয়েছিলাম ছাত্রদলে সভাপতি, সাধারণসম্পাদকসহ শীর্ষ পাঁচ নেতা। মহাসড়কে মাছের গাড়ি আটকে চাঁদাবাজির বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানান। এবং বলেন আমাদের নাম ব্যবহার করে ছাত্রদলের কেউ যদি এমন চাঁদাবাজির সাথে যুক্ত থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, আমাদের অবস্থান একদম পরিষ্কার। দলের নাম ব্যবহার করে যদি কেউ অন্যায় অনিয়মের সাথে জড়িত থাকে এবং যদি প্রমাণিত হয় তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নিবো। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটার বিরুদ্ধে অবশ্যই পদক্ষেপ নিবো।

চিংড়ি রেনু উৎপাদনকারি হ্যাচারি মালিক জাহাঙ্গীর বলেন, আমার দুইটা গাড়ি চিংড়ির রেনু গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আটক করে চাঁদা দাবি করেছে। আমি প্রথমে ৯৯৯ এ কল দিয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় কল দিয়ে কোনো প্রতিকার পায়নি। পরে আমার থেকে যারা মাছ কিনেছে তারা বাধ্য হয়ে বিকাশে প্রায় দেড়লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে গাড়ি উদ্ধার করেছে। আরেকটি গাড়ি থেকে চাঁদা নিতে না পেরে গাড়ি ভাংচুর করেছে এবং ড্রাইভারকেও মারধর করেছে। পরবর্তীতে থানাপুলিশের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান হয়েছে। এমন ঘটনা ঘটার কারনে আমাদের কাছ থেকে চিংড়ি পোনা ক্রয়ের জন্য ব্যবসায়ীরা আসতে চায় না আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্রদল নেতারা এরসাথে জড়িত তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি আমরা। 

বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছেলেকে মোটরসাইকেলসহ মেরে দেয় একটি হায়েস মাইক্রোবাস পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঐটা ধাওয়া করে। পরবর্তীতে মাইক্রোবাসচালক পুলিশের কাছে ৯৯৯ এ কল দিয়ে সাহায্য চাইলে পুলিশ তাদেরকে থানায় নিয়ে আসে। যেহেতু এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ডাকা হয়েছিলো বিষয়টি মিমাংসা করে দেয়া হয়েছে। মাছের গাড়ি ছেড়ে দেয়া হয়েছে। গাড়ি আটক করে চাঁদাবাজির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ওসি বলেন, এমন ঘটনা ঘটতেছে না বিষয়টি আমি বলবো না, তবে এবিষয়টি যেহেতু বন্দরথানাধীন সংশ্লিষ্ট এরিয়ার পুলিশ এটার বিষয়ে ব্যবস্থা নিবে।