চারপাশ ধ্বংস, তবু অটুট এক বাড়ি—নেপালের বন্যায় ‘অলৌকিক’ দৃশ্য

প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম
চারপাশ ধ্বংস, তবু অটুট এক বাড়ি—নেপালের বন্যায় ‘অলৌকিক’ দৃশ্য

সূত্রঃ সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় চারপাশের ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেলেও অক্ষত রয়েছে একটি ফিরোজা রঙের বাড়ি। নুয়াকোট জেলার ত্রিশুলি বাজার এলাকায় থাকা বাড়িটি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিরাকল হাউস’ বা ‘অলৌকিক বাড়ি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।


২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে হিমালয়ের একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে উপত্যকায় নেমে আসে। এর ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ত্রিশুলি নদী দিয়ে বরফ, পাথর, গাছপালা ও কাদামাটির বিশাল স্রোত নেমে আসে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।


বন্যার পানির প্রবল স্রোত বাড়িটির নিচের তলা দিয়ে বয়ে যায়। দরজা-জানালা পর্যন্ত ভেঙে নিয়ে যায় পানির তোড়। কিন্তু রিইনফোর্সড কংক্রিটে নির্মিত বাড়িটির মূল কাঠামো অক্ষত থাকে। ওপরের তলায় আশ্রয় নেওয়া পরিবারের সদস্যরাও প্রাণে বেঁচে যান।


বাড়িটির বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী প্রকাশ পাণ্ডে প্যাকুরেল, তাঁর স্ত্রী, দুই সন্তান এবং বৃদ্ধ মা-বাবা। বন্যার সময় প্রকাশ ও তাঁর স্ত্রী কাছের একটি দোকানে ছিলেন। তাঁদের সাত বছর বয়সী ছেলে মাত্র ১৫ মিনিট আগে স্কুলে চলে গিয়েছিল। আর ১১ বছর বয়সী মেয়ে তখন স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।


হঠাৎ কাদা, বরফ ও পানির প্রবল স্রোত ধেয়ে এলে পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। প্রকাশ ও তাঁর স্ত্রী দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসেন। প্রায় দুই ঘণ্টা তাঁরা বাড়িটির ভেতরে আটকা ছিলেন।


প্রকাশের স্ত্রী জানান, চারদিক থেকে বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষসহ বন্যার পানি বাড়িটিতে আঘাত করছিল। প্রচণ্ড স্রোতে বাড়িটি কাঁপছিল। তখন পরিবারের সবাই ধরে নিয়েছিলেন, হয়তো এটাই তাঁদের জীবনের শেষ মুহূর্ত।


তিনি বলেন, ‘আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম। সবাইকে বলেছিলাম, একসঙ্গে মরতে হবে। কিন্তু আমরা নতুন জীবন পেয়েছি। সবাই এটিকে অলৌকিক ঘটনা বলছে। আমরাও এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে বেঁচে আছি।’


পরে পরিবারের এক সদস্য বাড়ির ওপর লাল পতাকা উড়িয়ে হেলিকপ্টারে থাকা উদ্ধারকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর তাঁদের উদ্ধার করা হয়।


সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩২ মিনিটে আকস্মিক বন্যার ভয়াবহ স্রোত নেমে আসে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই অন্তত চারটি পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যায়। ত্রিশুলি নদীর ১৬৮ কিলোমিটার নিম্নধারা এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৯টি সেতু ও প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১০ শতাংশের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


স্থানীয় বাসিন্দা কেশব প্রসাদ বারাল বলেন, ‘এটা শুধু পানি ছিল না। বিশাল কাদার স্রোত আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল।’ স্ত্রীকে হাত ধরে বাঁচানোর চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে কাদার স্রোত থেকে রক্ষা করতে পারেননি বলেও জানান তিনি।


এদিকে, নেপাল ও চীনে এই দুর্যোগে সোমবার (৩১ আগস্ট) পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৯০৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজারের বেশি মানুষ।


প্রবল ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও ত্রিশুলি বাজারের এই বাড়িটির টিকে থাকা এখন স্থানীয়দের কাছে বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বাড়িটির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।



এমকে/বিএম২৪