স্বস্তির সবজির বাজারেও এখন চড়া দাম

প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৭ এএম
স্বস্তির সবজির বাজারেও এখন চড়া দাম

সূত্রঃ সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


মাছ-মাংসের চড়া দামের কারণে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই স্বস্তির খাবার হিসেবে সবজির ওপর নির্ভর করছিলেন। তবে সেই সবজির বাজারেও এখন বড় ধরনের মূল্যচাপ তৈরি হয়েছে। প্রায় এক দশক আগে ১ হাজার টাকা দিয়ে যে পরিমাণ সবজি কেনা যেত, এখন একই টাকায় তার অর্ধেকও কেনা যাচ্ছে না।


কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ২০১৭ সালের জাতীয় গড় খুচরা বাজারদর এবং ২০২৬ সালের ১৪ আগস্টের রাজধানীর বাজারদরের তুলনায় দেখা যায়, অধিকাংশ সবজির দাম দ্বিগুণ, তিন গুণ বা তারও বেশি বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বেগুন, শসা, ধুন্দল, বরবটি ও করলার দাম।


২০১৭ সালে প্রতি কেজি বেগুনের গড় দাম ছিল ৪০ টাকা ৭১ পয়সা। বর্তমানে রাজধানীর বাজারে গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকা এবং লম্বা বেগুন ১২০ টাকা কেজি। অর্থাৎ গোল বেগুনের দাম নয় বছরে বেড়েছে প্রায় ২৬৮ শতাংশ।


শসার দামও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ২০১৭ সালে প্রতি কেজি শসার গড় দাম ছিল ২৯ টাকা ৭৮ পয়সা। বর্তমানে তা ৮০ থেকে ১০০ টাকা। ফলে সর্বোচ্চ হিসাবে শসার দাম বেড়েছে প্রায় ২৩৬ শতাংশ।


একইভাবে ধুন্দলের দাম ২৯ টাকা ১৫ পয়সা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা, বরবটি ৩৯ টাকা ৩ পয়সা থেকে বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং করলা ৩৯ টাকা ৭২ পয়সা থেকে বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।


পটোলের দাম ৩৩ টাকা ৪৮ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৮০ টাকা। কচুর লতি ৩৫ টাকা ৫৬ পয়সা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা এবং কাঁকরোল ৪৫ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।


টমেটোর দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০১৭ সালে প্রতি কেজি টমেটোর গড় দাম ছিল ৫৯ টাকা ৮৫ পয়সা। বর্তমানে রাজধানীর বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি।


তবে সব ধরনের সবজির দাম একই হারে বাড়েনি। ২০১৭ সালে দেশি আলুর গড় দাম ছিল ২১ টাকা ৩৫ পয়সা। বর্তমানে তা প্রায় ৩০ টাকা কেজি। অর্থাৎ নয় বছরে দাম বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। পেঁপের দাম ২৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪০ টাকা।


একই সবজির ঝুড়িতে বাড়তি ১,৪৯০ টাকা


২০১৭ সালে আলু, বেগুন, করলা, শসা, টমেটো, পটোল ও ঢ্যাঁড়শ—এই সাত ধরনের সাধারণ সবজি মাসে চার কেজি করে কিনতে একটি পরিবারের খরচ হতো প্রায় ১ হাজার ৫০ টাকা। বর্তমানে একই পরিমাণ সবজি কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫৪০ টাকা।


অর্থাৎ নয় বছরে একই পরিমাণ সবজি কিনতে পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪৯০ টাকা। বৃদ্ধির হার প্রায় ১৪২ শতাংশ।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে একটি পরিবারের গড় মাসিক খাদ্য ব্যয় ছিল ১৪ হাজার ৩ টাকা। সে হিসাবে বর্তমানে শুধু সাত ধরনের সাধারণ সবজি কিনতেই একটি পরিবারের মাসিক খাদ্য ব্যয়ের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ চলে যাচ্ছে।


মাছ, মাংস ও ডিমের দাম আগে থেকেই বেশি থাকায় নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের খাদ্যতালিকায় সবজির গুরুত্ব বেড়েছিল। কিন্তু সবজির দামও দ্রুত বাড়তে থাকায় এসব পরিবারের খাদ্য ব্যয়ের চাপ আরও বাড়ছে।


উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব


দীর্ঘ মেয়াদে সবজির দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ও বিপণন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব রয়েছে। এর সঙ্গে চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও সরবরাহ সংকট যুক্ত হওয়ায় বাজারে নতুন করে মূল্যচাপ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


ফলে বেগুন, শসা, বরবটি, করলা, পটোল ও ধুন্দলের মতো সবজির দাম দ্রুত বেড়েছে।


রাজধানীর তুরাগের নতুন বাজারে গতকাল বাজার করতে আসা আমিনুল ইসলাম বলেন, সবজির দাম এতটাই বেড়েছে যে বাজারের বাজেটের বড় অংশ এখন সবজি কিনতেই চলে যাচ্ছে। আগে কয়েক ধরনের সবজি কেনা গেলেও এখন এক-দুটি কিনেই ফিরতে হচ্ছে।


সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ের দামে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকার কারণেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়ে।


তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, নিত্যপণ্যের দাম অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ফলে এসব পরিবারকে খাদ্য ব্যয়ে সমন্বয় করতে হচ্ছে। অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণে কিংবা অপেক্ষাকৃত কম দামের খাদ্যপণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাঁদের পুষ্টি গ্রহণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যচাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।