চট্টগ্রামে ছিনতাইয়ের রাজত্ব: গ্রেপ্তারের পরও কেন থামছে না অপরাধ?
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
পর্যটননগরী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম এখন চুরি ও ছিনতাইয়ের ক্রমবর্ধমান ঘটনায় নতুন করে আলোচনায়। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, পর্যটন এলাকা, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও জনসমাগমস্থলগুলোতে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ করছেন নগরবাসী। পুলিশের নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকলেও অপরাধের মাত্রা কমছে না বরং কৌশল বদলে আরও সংগঠিত হচ্ছে এসব চক্র।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় একাধিক চক্র এখন মূলত মোবাইল ফোনকে টার্গেট করছে। ছিনতাইয়ের পর দ্রুত হাতবদল, পাচার এবং পরিচয় পরিবর্তনের মাধ্যমে মোবাইল বাজারজাত করার একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কও গড়ে উঠেছে।
সন্ধ্যার পর বাড়ে আতঙ্ক
নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, আউটার রিং রোড, বায়েজিদ লিংক রোড, সিআরবি, বটতলী রেলস্টেশন, নিউমার্কেট, সদরঘাট, বহদ্দারহাট, নতুন ব্রিজ, চান্দগাঁও, বাকলিয়া অ্যাকসেস রোডসহ বেশ কয়েকটি এলাকাকে ছিনতাইপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় অপরাধীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্র থেকে ফেরার পথে দম্পতি, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
অনেক ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ছিনতাই সংঘটিত হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা বুঝে ওঠার আগেই অপরাধীরা এলাকা ত্যাগ করে।
মোবাইলই এখন প্রধান লক্ষ্য
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ছিনতাইকারীদের প্রধান লক্ষ্য এখন স্মার্টফোন। কারণ নগদ অর্থের ব্যবহার কমে যাওয়ায় মোবাইল ফোনই সবচেয়ে সহজে বিক্রিযোগ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছিনতাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলটি চক্রের অন্য সদস্যের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে সিমকার্ড ফেলে দেওয়া বা নষ্ট করা হয়। কয়েক ধাপে হাতবদলের পর মোবাইল চলে যায় বড় সংগ্রাহকদের কাছে। অভিযোগ রয়েছে, এরপর প্রযুক্তিগতভাবে মোবাইলের আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করে বিভিন্ন মার্কেট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি করা হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, একটি মোবাইল ছিনতাইয়ের পেছনে শুধু একজন ছিনতাইকারী নয়, বরং সংগ্রাহক, পরিবহনকারী, কারিগরি সহায়তাদাতা এবং বিক্রেতাসহ একটি সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক কাজ করে।
ভাসমান কিশোরদের ব্যবহার
নগরীর রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও জনবহুল বাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভাসমান কিশোরদের একটি অংশ বিভিন্ন অপরাধচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রের দাবি, এসব কিশোরকে ব্যবহার করা হয় ছিনতাই হওয়া মোবাইল বহন, লুকিয়ে রাখা এবং দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কাজে। বয়স কম হওয়ায় অনেক সময় তারা সহজেই সন্দেহের বাইরে থেকে যায়।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা কয়েকজন কর্মী বলেন, পারিবারিক ভাঙন, দারিদ্র্য, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক তদারকির অভাবের কারণে এসব কিশোর অপরাধচক্রের হাতে ব্যবহার হচ্ছে।
পরিসংখ্যানে উদ্বেগ
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্যমতে, গত এক বছরে নগরীর ১৬ থানায় ১০৬টি ছিনতাই মামলা হয়েছে। একই সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৪৫ জনকে।
তবে পুলিশের বিভিন্ন সূত্র বলছে, প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। কারণ অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করতে আগ্রহী হন না। মোবাইল ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কম এবং আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ার কারণে অনেকে মামলা এড়িয়ে যান।।।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নিবন্ধিত মামলার বাইরেও বিপুলসংখ্যক ঘটনা ঘটছে, যা অপরাধের প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করছে।
গ্রেপ্তারের পরও কেন ফিরে আসে অপরাধীরা?
নগরীর বিভিন্ন থানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রেপ্তারের পর অনেক অভিযুক্ত দ্রুত জামিনে মুক্ত হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ছিনতাইয়ের মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা বিচার শেষ হওয়ার আগেই মুক্ত হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পুনর্বাসন বা নজরদারির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অপরাধীরা আবার আগের চক্রে ফিরে যায়।
অপরাধের আড়ালে প্রভাবশালীদের ছায়া?
অনুসন্ধানকালে একাধিক সূত্র দাবি করেছে, কিছু এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, অসাধু রাজনৈতিক কর্মী এবং বিভিন্ন মহলের ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধচক্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযানের তথ্য আগেই ফাঁস হয়ে যায়। ফলে অভিযানের আগে অপরাধীরা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও অভিযোগগুলো যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে কারা?
পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, পর্যটক, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রাইডশেয়ার ব্যবহারকারী এবং রাতের শিফটে কর্মরত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিশেষ করে কানে হেডফোন ব্যবহার, হাতে মোবাইল নিয়ে হাঁটা কিংবা নির্জন এলাকায় একা চলাচলকারীদের টার্গেট করছে ছিনতাইকারীরা।
পুলিশের অবস্থান
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণসংযোগ) আমিনুর রশিদ বলেন, অপরাধ দমন ও ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে নগর পুলিশের প্রতিটি থানা সক্রিয় রয়েছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু পুলিশের পক্ষে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতা এবং জনসাধারণের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
সমাধান কোথায়?
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, শুধু ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মোবাইল পাচার সিন্ডিকেট, চোরাই পণ্যের বাজার, আইএমইআই পরিবর্তনের নেটওয়ার্ক এবং অপরাধের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে দিতে হবে।
একই সঙ্গে ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় সিসিটিভি নজরদারি বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত সড়কবাতি স্থাপন, নিয়মিত টহল জোরদার এবং ভাসমান শিশু-কিশোরদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
নগরবাসীর প্রশ্ন একটাই প্রতিদিন গ্রেপ্তার হচ্ছে অপরাধী, চলছেও অভিযান; তারপরও কেন কমছে না ছিনতাই? এই প্রশ্নের কার্যকর উত্তর খুঁজে বের করাই এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বড় চ্যালেঞ্জ।









