বেপরোয়া স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আলী, এক রাতে তিন হামলা, নারীসহ রক্তাত্ব ৪

প্রকাশিত: ০১ জুন ২০২৬, ০৭:১৪ এএম
বেপরোয়া স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আলী, এক রাতে তিন হামলা, নারীসহ রক্তাত্ব ৪

ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী ব্যুরো:

রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানাধীন খরবোনা নদীরধার ও কেদুরমোড় এলাকায় একই রাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি পৃথক সহিংস হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আলী ও তাঁর বাহিনী।

রোববার (৩১ মে) সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলা এসব হামলায় দুই নারী শ্লীলতাহানি ও কুপিয়ে আহত হয়েছেন, দুই যুবক গুরুতর জখম অবস্থায় রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং রাকিব নামের এক যুবকের বসতবাড়িতে ভাঙচুর-লুটপাট চালানো হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার পরও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি, বরং হামলাকারীরা পুলিশের সামনেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

প্রথম আঘাত: 

সন্ধ্যায় নারীর শ্লীলতাহানি ও শাশুড়িকে কুপিয়ে জখম

ঘটনার সূত্রপাত রোববার সন্ধ্যায়। বোয়ালিয়ার খরবোনা নদীরধার এলাকার বাসিন্দা শ্রাবণী (২২) বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আলী (৩২) এসে তাঁর গায়ে থুথু ফেলেন। প্রতিবাদ করলে আলী প্রকাশ্যে সজোরে চড়-লাথি মারেন শ্রাবণীকে। ভয়ে তিনি বাড়ির ভেতরে চলে গেলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আলী, মারুফ (৩০) ও সুজনসহ ১০/১২জন গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে।

শ্রাবণীর বর্ণনা অনুযায়ী, “আলী ও সুজন আমার হাত-পা চেপে ধরে শ্লীলতাহানি করতে থাকে এবং এলোপাতাড়ি চড়-ঘুষি ও লাথি মারতে থাকে। আমার চিৎকারে শাশুড়ি রানী বেগম (৪৭) এগিয়ে এলে আলী ধারালো হাসুয়া দিয়ে তাঁর মাথায় পরপর দুটি কোপ দেয়।” রানী বেগম রক্তাক্ত জখম হয়ে ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারান। এরপরও হামলাকারীরা শ্রাবণীর শাড়ির স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে মারধর চালিয়ে যায় এবং বসতবাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। স্থানীয়রা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালায়। পরে উভয়কে উদ্ধার করে রামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়।

শ্রাবণী আরও জানান, “আলী দীর্ঘদিন ধরে আমাকে কুপ্রস্তাব দিত, দেখলেই থুথু ফেলত। প্রতিবাদ করার সাহস পাইনি। আজকের ঘটনা তারই চূড়ান্ত পরিণতি।”

দ্বিতীয় আঘাত: 

রাতে প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে দুই যুবককে কুপিয়ে জখম

সন্ধ্যার নৃশংসতার রেশ কাটতে না কাটতেই রাত ১০টার দিকে একই বাহিনী আঘাত হানে কেদুরমোড় এলাকায়। স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আলী প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে এবং তার বাহিনী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘিরে ফেলে দুই যুবক আলামিন (৩৫) ও সানারুলকে (৩২)।

এক প্রত্যক্ষদর্শী চা-দোকানি জানান, “আলীকে দেখে আলামিন দৌড় দিতে গেলে আলী কোমর থেকে পিস্তল বের করে তাকে আটক করে। এরপর ২০-২৫ জন মিলে তাকে ঘিরে ফেলে।” আলী, মারুফ ও সুজন ধারালো ছুরি ও রামদা দিয়ে আলামিনের বুকে, পাঁজরে ও পায়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। একই সময় বাঁশের রড, শাবল, চায়নিজ কোরাল ও হাতুড়ি দিয়ে সানারুলকে পিটিয়ে অচেতন করে ফেলা হয়। দুই যুবকের চিৎকার শুনেও প্রথমে কেউ এগিয়ে যায়নি।।

ঘটনাস্থলে বোসপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শহিদ পৌঁছালে হামলাকারীরা পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। পুলিশ রাস্তার অপর পাশে অবস্থান নিলেও উদ্ধারে এগোয়নি। স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে রক্তাক্ত দুই যুবককে উদ্ধার করে রামেক হাসপাতালের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে পাঠান। আলামিন ও সানারুল উভয়েই সেখানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি আছেন। সানারুল এখনো অচেতন।

আহত আলামিন হাসপাতালের শয্যায় জানান, “আলী পিস্তল তাক করলে আমি ভয়ে দাঁড়িয়ে যাই। তারপর ওরা আমার বুকে পাজরে, পায়ে, পেটে এলোপাতাড়িভাবে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলে। 

তৃতীয় আঘাত: পুলিশের সামনে বসতবাড়িতে হামলা

আলামিন ও সানারুলকে উদ্ধারের পরও ঘটনা শেষ হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান করার মধ্যেই আলী বাহিনী কেদুরমোড়ের নদীরধার এলাকায় যেয়ে রাকিব নামের আরেক যুবকের বসতবাড়িতে গিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পুরো সময় পুলিশ নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। হামলা শেষে আলী ও তার বাহিনী ধারালো অস্ত্রসহ ঘটনাস্থল থেকে চলে গেলেও পুলিশ কাউকে আটক করেনি, কোনো বাধাও দেয়নি।

পেছনের ঘটনা: এক মাস আগের হামলা যে বীজ বুনেছিল

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রায় এক মাস আগে, ৫ এপ্রিল, একই আলী ও তার সহযোগী স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সৈকত পারভেজের নেতৃত্বে ৩৫-৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল আলামিনের ভাই মুস্তাকিনের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলায় মুস্তাকিনের ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী শ্লীলতাহানির শিকার হন, লুট হয় দেড় ভরি স্বর্ণালঙ্কার, ৪০ জোড়া কবুতর ও দুটি ছাগল।

৭ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে মুস্তাকিন জানিয়েছিলেন, আলামিন আগে আলীর সঙ্গে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকলেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরায় ২০২৬ সালের শুরু থেকে তাঁদের পুনরায় মাদক কারবারে যুক্ত হতে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। রাজি না হওয়ায় এবং মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এসব হামলা চালানো হচ্ছে। বর্তমানে ওই এলাকায় সৈকত ও আলী বাহিনী রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুরো মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সেই ঘটনার পর এক মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ বা রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে আলী বা সৈকতের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং ৩১ মে এসে ফের তারা রক্তগঙ্গা বইয়ে দিল—এই সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ছিল আরও প্রকট।

পুলিশের ব্যর্থতা: দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সংস্কৃতি

৩১ মের তিনটি হামলাতেই পুলিশের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কেদুরমোড়ের ঘটনায় বোসপাড়া ফাঁড়ির পুলিশ ঘটনাস্থলে আসার পরও উদ্ধারকাজে অংশ নেয়নি, হামলাকারীদের বাধা দেয়নি, পরে অন্য একটি বসতবাড়িতে হামলার সময়ও নীরব থেকেছে। এমনকি হামলাকারীরা পুলিশ লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়ার পরও কোনো পাল্টা ব্যবস্থা দেখা যায়নি। পুলিশের এই নিষ্ক্রিয়তা নাগরিকদের মধ্যে গভীর অনাস্থা তৈরি করছে।

এ বিষয়ে বোয়ালিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রবিউল ইসলাম পূর্বে জানিয়েছিলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এক মাস আগের হামলার লিখিত অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলন, হাসপাতালের মেডিকেল সার্টিফিকেট—সব থাকার পরও আজ অবধি কেউ গ্রেপ্তার হননি। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—“আর কত অভিযোগ দিতে হবে? আর কত রক্ত ঝরাতে হবে?”

রাজনৈতিক ছত্রছায়া: দলের ভাবমূর্তির জন্য কলঙ্ক

স্বেচ্ছাসেবক দলের একাধিক নেতার নাম জড়িয়ে যাওয়ায় বিষয়টি এখন রাজনৈতিক মোড় নিয়েছে। এলাকায় প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে ত্রাস সৃষ্টি, নারী নির্যাতন ও মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ—এসবই একটি রাজনৈতিক দলের তৃণমূল নেতৃত্বের চরম অধঃপতনকেই ইঙ্গিত করে। অথচ দলীয়ভাবে এ বিষয়ে এখনো কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়রা বলছেন, “আলী-সৈকতের নামে এলাকায় আতঙ্ক। পুলিশ ভয় পায়, মানুষ ভয় পায়। এদের সরানো না গেলে এখানে সুশাসন ফিরবে না।'

ভুক্তভোগীদের শেষ কথা

শ্রাবণী বলেন, “আমি ন্যায়বিচার চাই। যে আমার শরীরে হাত দিয়েছে, আমার শাশুড়ির মাথায় কোপ দিয়েছে, তার শাস্তি হওয়া চাই।” হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আলামিন বলেন, “পুলিশের সামনে কুপিয়েছে, তবু কেউ কিছু করেনি। আমরা কি বাঁচতে পারব?”