বিপিসির সাবেক কর্মকর্তার অঢেল সম্পদ, স্ত্রীর ‘ভুয়া’ ব্যবসার আড়ালে অর্থ পাচারের অভিযোগ

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম
বিপিসির সাবেক কর্মকর্তার অঢেল সম্পদ, স্ত্রীর ‘ভুয়া’ ব্যবসার আড়ালে অর্থ পাচারের অভিযোগ

সূত্রঃ সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনি লাল দাশের বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়ম, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, নথিপত্র গায়েব এবং অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানেও তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানা গেছে।


অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে প্রবেশের সময় প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও অজ্ঞাত প্রভাবের কারণে মনি লাল দাশ বিপিসিতে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে তিনি মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) এবং সর্বশেষ জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদে দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিটেডের (এসএওসিএল) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।


তথ্য অনুসারে, ১৯৯৬ সালের ২৪ অক্টোবর দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত বিপিসির সহকারী ব্যবস্থাপক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণির স্নাতক ডিগ্রি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু মনি লাল দাশের ফলাফল ছিল তৃতীয় শ্রেণির। এরপরও ১৯৯৯ সালে তিনি সহকারী ব্যবস্থাপক (এমআইএস) পদে বিপিসিতে যোগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


চলতি বছরের ১৩ আগস্ট অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার আগে দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতির অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের মধ্যে নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র গায়েব করার অভিযোগও রয়েছে।


সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিভিন্ন গণমাধ্যমে মনি লাল দাশের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর এসব সংক্রান্ত ফাইল ও নথিপত্র গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট বিভাগে সংরক্ষিত নথিপত্রেরও এখন হদিস মিলছে না বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।


তবে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে দুদকের অনুসন্ধানে। সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে মনি লাল দাশের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়ার পর দুদক অনুসন্ধান শুরু করে।


অনুসন্ধানে মনি লাল দাশ ও তাঁর স্ত্রী সেপিকা দাশের নামে আড়াই কোটি টাকার বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মনি লাল দাশের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও পারিবারিক ব্যয়সহ মোট সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি ১৭ লাখ ২৭ হাজার ২০৭ টাকা। এর বিপরীতে গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া গেছে ৩ কোটি ৪০ লাখ ৯২ হাজার ১৯৩ টাকা। ফলে ৭৬ লাখ ৩৫ হাজার ১৪ টাকার সম্পদের গ্রহণযোগ্য উৎস পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।


অন্যদিকে, সেপিকা দাশ পেশায় গৃহিণী হলেও ২০১০-১১ করবর্ষ থেকে নিবন্ধিত করদাতা হিসেবে নিজেকে সঞ্চয়পত্র, শেয়ার ব্যবসা, কমিশন ব্যবসা ও মৎস্য চাষি হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন।


তবে দুদকের অনুসন্ধানে তাঁর কমিশন ব্যবসা কিংবা মৎস্য চাষের অস্তিত্ব এবং এ-সংক্রান্ত উপযুক্ত নথিপত্র পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুসন্ধানকারী সংস্থার মতে, স্বামীর অবৈধ আয়কে বৈধ দেখানোর উদ্দেশ্যে এসব ব্যবসায়িক পরিচয় ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।


দুদকের তথ্য অনুযায়ী, সেপিকা দাশের অর্জিত সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৪৪ লাখ ৬১ হাজার ৯২৭ টাকা। এর বিপরীতে ১ কোটি ৮৭ লাখ ১৭ হাজার ২৫৫ টাকার আয়ের বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।


দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ অনুসন্ধান শেষে মনি লাল দাশ ও তাঁর স্ত্রী সেপিকা দাশের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের সুপারিশ করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সম্প্রতি স্বামী-স্ত্রীর নামে পাওয়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তালিকাসহ অনুসন্ধান প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়েছে। এতে পৃথকভাবে দুজনের নামে সম্পদ বিবরণী দাখিলের সুপারিশ করা হয়েছে।


এদিকে, নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র গায়েব এবং অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে মনি লাল দাশের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।


এর আগে ২০২৪ সালে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও অসংগতির অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন মনি লাল দাশ। চট্টগ্রামের একটি দৈনিককে তিনি দাবি করেছিলেন, একটি চক্র তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এবং ভিত্তিহীন চিঠি দিয়ে দুদককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। তিনি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন দাবি করে অতীতে টিউশনি করেও জীবনযাপন করার কথা জানিয়েছিলেন।


বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অবসরে যাওয়ার পরও মনি লাল দাশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।