বিদেশি পিস্তল, সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক ও পুরোনো বিরোধ: রাজু হত্যা তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন রৌফাবাদে আলোচিত হাসান ওরফে রাজু হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। আজ দুপুরে বায়েজিদ বোস্তামি থানা প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিং এ তথ্য জানান উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর), জনাব মোঃ আমিরুল ইসলাম ।
হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই কক্সবাজার, ডবলমুরিং, রৌফাবাদ ও চান্দগাঁও এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উদ্ধার করা হয়েছে বিদেশি পিস্তল, গুলি ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সিএনজি অটোরিকশা। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে পূর্বশত্রুতা, আধিপত্য বিস্তার ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের যোগসূত্র যা এখন গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত ৭ মে রাত সাড়ে ৯টার দিকে রৌফাবাদ শহীদ মিনার সংলগ্ন বাঁশবাড়িয়া গলিতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন রাউজানের কদলপুর এলাকার যুবক মো. হাসান প্রকাশ রাজু (২৪)। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় ১২ বছর বয়সী রেশমি আক্তার নামের এক কিশোরী। ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
নিহতের মা সকিনা বেগমের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় হত্যা মামলা রুজু হয়। এরপর সিএমপির উত্তর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে এবং থানার ওসি মো. আব্দুল করিমের নেতৃত্বে তদন্তে নামে পুলিশের বিশেষ টিম।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, মোবাইল ট্র্যাকিং ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে কক্সবাজারের সুগন্ধা সমুদ্রসৈকত এলাকা থেকে মূল শুটার হিসেবে সন্দেহভাজন সৈয়দুল করিমকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে রাজুকে গুলি করার কথা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যমতে উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড তাজা গুলি এবং ঘটনার সময় পরিহিত পোশাক।
পরে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সিএনজি অটোরিকশা উদ্ধার করে চালক আব্দুল মান্নানকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তের ধারাবাহিকতায় আরও চারজনকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে দুজনকে সরাসরি সহযোগী এবং অপর দুজনকে পরিকল্পনা ও সহায়তার সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করছে পুলিশ।
পুলিশের অপরাধ তথ্য ব্যবস্থাপনা (সিডিএমএস) পর্যালোচনায় গ্রেফতার হওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে পূর্বেও একাধিক মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রধান আসামি সৈয়দুল করিমের বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে মামলা রয়েছে। এছাড়া আবু বক্কর ছিদ্দিক প্রকাশ খোকনের বিরুদ্ধে রাউজান থানায় একাধিক সংঘর্ষ, হামলা, চুরি ও হত্যাচেষ্টা মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অপর আসামি আজগর আলীর বিরুদ্ধেও চুরির মামলা রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, নিহত রাজুর সঙ্গে স্থানীয় একটি গ্রুপের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত এবং এতে পেশাদার অস্ত্রধারীরা অংশ নেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশের ধারণা, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বাইরে আরও কয়েকজন সরাসরি ঘটনায় অংশ নেয়, যারা এখনো পলাতক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রৌফাবাদ ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কিশোর গ্যাং, অস্ত্রবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা বাড়লেও কার্যকর অভিযান ছিল সীমিত। ফলে অপরাধচক্রগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই হত্যাকাণ্ড সেই অস্থির পরিস্থিতিরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস, পরিকল্পনাকারী ও পলাতক আসামিদের শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একইসঙ্গে ঘটনার পেছনে কোনো বড় অপরাধচক্র বা আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ জড়িত কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।









