গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মুনের রহস্যজনক মৃত্যু, বোয়ালিয়া থানা পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ
রাজশাহী প্রতিনিধি:
রাজশাহী মহানগরীর ষষ্ঠীতলা এলাকায় মুন গার্মেন্টসের মালিক মুন (৩৮) নামের এক ব্যবসায়ীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকালে নিজ বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের স্ত্রী স্বামীর মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে মানতে নারাজ।
নিহত মুন মহানগরীর ষষ্ঠীতলা এলাকার মৃত আব্দুল সালামের ছেলে এবং নিউ মার্কেট এলাকার মুন গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই কন্যাসন্তানসহ অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
নিহতের ছোট ভাই সানি জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে মুন ও তার স্ত্রী একসঙ্গে বাজারে যান। প্রায় এক ঘণ্টা পর বাড়িতে ফিরে তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করেন। পরে দ্রুত তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, নিহত স্ত্রীর খালাতো ভাই সজিব বলেন, সকালে বাসার ছাদে ছাগলকে খাবার দেওয়ার পর প্রচণ্ড গরমে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গৃহকর্মী জানান, আজকে সকালে মুন আর ইস্তি একসাথে বাজারে যাই, এরপর হাসিমুখেই বাড়িতে ফিরে। তখন আমি ওইখানে বসে কাজ করছিলাম। এরপর হঠাৎ চিল্লাচিল্লি শুনতে পাই,, বেশ কিছুক্ষণ থেকেই বাড়ির ভেতর থেকে চিল্লাচিল্লি শুনতে পাই। এরপর মুনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী কান্নাকাটি করতে করতে বলছিল আমার স্বামীকে মেরে ফেলল, আমার স্বামীকে তোরা মেরে ফেল্লি।
তিনি আরও বলেন, আমি পাশের বাসায় কাজ করি দীর্ঘদিন থেকে, তবে মুনদের বাসায় কাজ করি না। তারপরও ওই বাসায় আমার যাতায়াত ছিল। সান, মুন, সানি আর ওর বোনের এই চারজনের মধ্যে জমি আর দোকান নিয়ে ঝামেলা লেগেই থাকতো। তবে মুনের প্রধান সমস্যা ছিল ওর মায়ের সাথে। বেশকিছু দিন আগে এদের মধ্যে একটা গন্ডোগোল হয়েছিল, তবে পরে তা পারিবারিকভাবেই মিমাংসা হয়ে গেছিল।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, নিহত মুনের পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা ও ব্যবসা সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী বলেন, ভাই-বোনদের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে প্রায়ই বিরোধ দেখা দিত। ঘটনার দিন সকালে বাড়ি থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শোনার পর এলাকাবাসী জড়ো হয়। পরে জানতে পারেন মুনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী দাবি করেন যে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জমি ও দোকানপাট নিয়ে পূর্ব থেকেই বিরোধ ছিল। যদিও তিনি ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী নন।
সরেজমিনে দেখা যায়, মৃত্যুর পর মরদেহ বাড়ির নিচতলায় রাখা ছিল। এ সময় পরিবারের সদস্যরা সাংবাদিকদের ছবি তুলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। স্থানীয়ভাবে মরদেহ দ্রুত দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল বলেও কয়েকজন প্রতিবেশী দাবি করেন।
এ বিষয়ে দুপুরে বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে এসআই গোলাম রসূলকে রেফার করেন।
এর কিছুক্ষণ এসআই গোলাম রসূল সাংবাদিকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে বিস্তারিত শোনার পর, ঘটনাস্থলে যেতে অপারগতা জানান।
এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি পুনরায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করে কোনো সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই জানান, ঘটনাস্থলে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অসুস্থ হয়ে পড়ার পর মুনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ফলে সরজমিনে যাওয়া কিংবা এখানে অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সরজমিনে কোন অনুসন্ধান ছাড়ায় একজন যুবকের বির্তকীত মৃত্যুকে মাত্র ২মিটিনের ব্যবধানে অসুস্থতা জনিত কারণে ঘোষণা করা, সত্যি রহস্যের বেড়াজাল সৃষ্টি করে।
তাহলে কি এই মৃত্যুর পিছনে পুলিশ ও জড়িত?
এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিহতের পরিবার আর্থিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় ঘটনাটি দ্রুত দাফনের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছে। তারা আরও দাবি করেন, বোয়ালিয়া থানা পুলিশ, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট মহলকে প্রভাবিত করে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের বিভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেলেও সেগুলোর স্বাধীন সত্যতা এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনের অপেক্ষা রয়েছে।









