ইসলামী ব্যাংকে নজিরবিহীন শুদ্ধি অভিযান: ২০০ কর্মী চাকরিচ্যুত, ওএসডি প্রায় ৫ হাজার

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:৫৮ পিএম
ইসলামী ব্যাংকে নজিরবিহীন শুদ্ধি অভিযান: ২০০ কর্মী চাকরিচ্যুত, ওএসডি প্রায় ৫ হাজার

ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন শুদ্ধি অভিযান। চাকরিবিধি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ব্যাংকের ২০০ কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। একই সঙ্গে যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ায় ৪ হাজার ৯৭১ জন কর্মীকে করা হয়েছে ওএসডি (অন সার্ভিস ডিউটি)। ফলে ব্যাংকের ভেতরে নতুন করে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।


যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষার উদ্যোগ


বাংলাদেশ ব্যাংক ও আদালতের নির্দেশনায় গত শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ইসলামী ব্যাংক বিশেষ যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষা আয়োজন করে। মোট ৫ হাজার ৩৮৫ জন কর্মকর্তাকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য বলা হলেও উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৪১৪ জন। তারা নিয়মিত কাজে বহাল থাকলেও বাকিদের পরদিন থেকেই ওএসডি করা হয়। অন্যদিকে পরীক্ষার বিরোধিতা বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগে ২০০ জনকে সরাসরি চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।


ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন,


> “এস আলম গ্রুপের সময় অযোগ্য লোক নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকটিকে ধ্বংস করা হয়েছে। এখন ব্যাংকের স্বার্থেই সবাইকে যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে।”




কর্মীদের দাবি ও আইনি লড়াই


ওএসডি হওয়া কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এক মাস আগে তাদের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট নিয়মিত প্রমোশনাল পরীক্ষা চালানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সেই আদেশ অমান্য করে নতুন পরীক্ষা নেয়, যা তারা বেআইনি বলছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, তারা আবার আদালতের শরণাপন্ন হবেন।


বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান


এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন,


> “ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্যে পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনা দেশে এই প্রথম। সাধারণত পদোন্নতির জন্য ভাইভা হয়, কিন্তু কর্মীদের মান যাচাই পরীক্ষার বিষয়টি নতুন অভিজ্ঞতা।”




তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় নিয়োগ বা দক্ষতা যাচাই তাদের এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে। তবে আইন ও নীতিমালা মেনেই তা করতে হবে।


পটভূমি: এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ ও সংকট


২০১৭ সালে চট্টগ্রামের প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন কোনো পরীক্ষা ছাড়াই হাজারো কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে ব্যাংকের প্রায় অর্ধেক কর্মী ওই অঞ্চলের মানুষ।


অভিযোগ রয়েছে, এস আলম গ্রুপ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর নানা কৌশলে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করে, যা ব্যাংকটিকে গভীর আর্থিক সংকটে ফেলে। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে এস আলমের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে নতুন পর্ষদ নিয়োগ দেয়। এরপর থেকেই অযোগ্য নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের বাছাই করতে যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়।


বিশেষজ্ঞদের মতামত


অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ইসলামী ব্যাংকের এই শুদ্ধি অভিযান দেশের ব্যাংকিং খাতে এক নতুন নজির। সাধারণত পদোন্নতি পরীক্ষার মাধ্যমে সীমিত মূল্যায়ন করা হলেও এবার সরাসরি দক্ষতা যাচাই করে চাকরি বহাল রাখার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।


তাদের মতে, আদালত, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপরই এখন ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। যদি এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে, তবে হাজার হাজার কর্মীর চাকরি অনিশ্চয়তায় পড়বে। আর আদালত যদি কর্মীদের দাবিকে গুরুত্ব দেয়, তবে ব্যাংককে নতুন করে সমাধান খুঁজতে হবে।


বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের এ উদ্যোগ কেবল প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতেই বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।