বিএনপিতে প্রার্থী পরিবর্তনের ইঙ্গিত, ২০টির বেশি আসনে তীব্র মতভেদ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি তাদের ঘোষিত প্রার্থীদের তালিকায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। দলীয় পর্যবেক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে জানা গেছে, অন্তত ২০টিরও বেশি আসনে মনোনয়ন নিয়ে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। এসব আসনে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে, যা নিয়ে উদ্বিগ্ন দলীয় হাইকমান্ড।
দলটি ইতোমধ্যে ২৩৮টি আসনে সম্ভাব্য একক প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলেও কিছু এলাকায় বিরোধ ও অসন্তোষের কারণে পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া চলছে। বিএনপি ঘোষিত প্রার্থীদের কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ের ঐক্য এবং ত্যাগী নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দলীয় ঐক্য বিনষ্টের অভিযোগে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ঘোষিত প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ের জনপ্রিয়তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হচ্ছে। যাচাই–বাছাইয়ের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে প্রাথমিক তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “কিছু আসনে ক্ষোভ থাকতেই পারে। আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছি। ফাঁকা আসনগুলোর সবই মিত্রদের জন্য থাকবে না; এর কিছুতে আমাদেরও প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।”
গত ৩ নভেম্বর গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৩৭ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এটি প্রাথমিক তালিকা—চূড়ান্ত নয়। শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে আসন ভাগাভাগি ও প্রার্থী পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ঘোষণার পর থেকেই সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, কক্সবাজার, নাটোর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ একাধিক জেলায় মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা বিক্ষোভ করছেন। সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম ও মেহেরপুরে বিক্ষোভের পাশাপাশি কিছু স্থানে সংঘর্ষ ও আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সাতক্ষীরা-২ আসনে (সদর-দেবহাটা) বিএনপির প্রার্থী আবদুর রউফের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে দলটির মহাসচিবের কাছে আবেদন করেছেন সদর উপজেলার ১২ ইউনিয়নের ৩৩ জন নেতা। তাঁরা ত্যাগী নেতা আব্দুল আলিমকে প্রার্থী করার দাবি জানিয়েছেন। একইভাবে সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি) আসনে ‘গরিবের বন্ধু’ খ্যাত ডা. শহিদুল আলমকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
মেহেরপুর-২ (গাংনী) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী আমজাদ হোসেনের পরিবর্তে জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদকে প্রার্থী করার দাবিতে আন্দোলন চলছে। চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরীকে বাদ দিয়ে কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে প্রার্থী করায় স্থানীয় নেতারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে কর্নেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহারকে মনোনয়ন না দেওয়ায় তার সমর্থকরা সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। নরসিংদী-৪, মুন্সীগঞ্জ-২, নোয়াখালী-৫, ঠাকুরগাঁও-৩, রাজশাহী-৪ ও ৫ আসনেও একই ধরনের ক্ষোভ দেখা গেছে।
দলীয় নীতিনির্ধারকদের মতে, কিছু যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতা মনোনয়ন না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাদের কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে ভোট বিভাজনের ঝুঁকি বিবেচনায় বিএনপি কিছু আসনে প্রার্থী পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এ ছাড়া ফাঁকা থাকা ৬৩টি আসনের মধ্যে অন্তত ১১টিতে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সম্ভাব্য আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা-৯, ঢাকা-১৮, গাজীপুর-১, টাঙ্গাইল-৫, চট্টগ্রাম-৬, চট্টগ্রাম-৯, চট্টগ্রাম-১১, ঝিনাইদহ-৪, মাদারীপুর-২ ও সিরাজগঞ্জ-১।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঘোষিত আসনের মধ্যে অন্তত ২৩টিতে মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এসব এলাকায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে, কিছু জায়গায় সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
সবশেষে দলীয় হাইকমান্ড জানিয়েছে, পর্যবেক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন শেষে প্রয়োজন মনে করলে প্রার্থী পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।









