ঘুষের ভিডিও ভাইরাল — তবুও বহাল ভূমি কর্মকর্তা কামাল: প্রশাসনের নীরবতা না কি গোপন সুরক্ষা?

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ০২:৩৮ পিএম
ঘুষের ভিডিও ভাইরাল — তবুও বহাল ভূমি কর্মকর্তা কামাল: প্রশাসনের নীরবতা না কি গোপন সুরক্ষা?

ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী প্রতিনিধি:

রাজশাহীর পবা উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস যেন আজ অনিয়মের এক ‘অঘোষিত লেনদেন কেন্দ্র’। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) কামাল হোসেন বছরের পর বছর ধরে দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অংকের ঘুষ আদায় করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে কামাল হোসেনের ঘুষ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, অফিসকক্ষে সাদা কাগজের ফাইলের নিচে টাকা রেখে এক ব্যক্তির সঙ্গে লেনদেন করছেন তিনি। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয়—ভিডিও প্রকাশের পরও তিনি বহাল তবিয়্যতে দায়িত্ব পালন করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভূমি অফিসের প্রতিটি কাজে টাকার খেলা চলছে—নামজারি, খাজনা, কাগজ যাচাই বা জমির মালিকানা সংশোধন, সবকিছুতেই ‘দালালের হাত ঘুরে’। কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়, বা ইচ্ছাকৃতভাবে জটিল করে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী আজিজুল ইসলাম জানান, “জমির নামজারি করতে গিয়ে পাঁচবার অফিসে গেছি। সরকারি ফি দিয়েও দালালের কাছে টাকা দিতে হয়েছে। না দিলে তারা বলেছে—‘ফাইলটা অফিসার সই দেবে না।’”

ভাইরাল ভিডিও নিয়ে কর্মকর্তার বিরোধপূর্ণ বক্তব্য

ঘুষ নেওয়ার ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে ভূমি কর্মকর্তা কামাল হোসেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি বলেন, “ভিডিওর বিষয় এক-দুই মাস আগেই অফিসিয়ালি ফয়সালা হয়ে গেছে। ভিডিও তো ডিলিট হয়ে যাওয়ার কথা। আপনাকে আবার কে ভিডিও দিলো? আপনি ফোন রাখেন।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন।

কামালের এই বক্তব্যের পরদিন পবা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জাহিদ হাসান–এর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য দেন। তিনি বলেন, “ভিডিও ভাইরালের বিষয়ে আমি জানতাম না। এখনই আপনার কাছ থেকে জানলাম। আমি বিষয়টি দেখে আগামীকাল আপনাকে জানাবো।”

অর্থাৎ কামাল হোসেনের দাবি—“বিষয়টি অফিসিয়ালি ফয়সালা হয়ে গেছে”—এই বক্তব্য সহকারী কমিশনারের বক্তব্যেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

একজন কর্মকর্তা যদি প্রশাসনিকভাবে ‘ফয়সালা’ হয়ে যাওয়া ঘটনার খবরই না পান, তবে সেখানে গোপন যোগাযোগ বা প্রভাব বলয়ের আশঙ্কা থেকেই যায়।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এই প্রকাশ্য দুর্নীতি ও ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া প্রশাসনের গাফিলতি নয়—বরং এতে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ছায়া কাজ করছে।

একজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

“এ অফিসের প্রতিটি দালাল জানে, টাকা দিলেই কাজ হয়। এখন ভিডিও প্রকাশের পরও যদি কিছু না হয়, তাহলে মানুষ আর কোথায় যাবে?”

জাতীয় প্রেক্ষাপট ও অনুরূপ ঘটনা

বাংলাদেশের ভূমি অফিসসমূহে এ ধরনের অনিয়ম নতুন নয়।

সাতক্ষীরায় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একজন ভূমি কর্মকর্তাকে ঘুষ লুকাতে গিয়ে দুদক হাতে-নাতে আটক করে।

খুলনা, চট্টগ্রাম ও রংপুরেও গত এক বছরে অন্তত ১১টি ঘুষসংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনার দায় শুধু ব্যক্তির নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী আমলাতান্ত্রিক দোষচক্রের।

টিআইবি’র এক জরিপে উঠে এসেছে, ভূমি সেবা খাতে দুর্নীতির হার ৫১%, যা দেশের সরকারি সেবা খাতগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সমাজবিজ্ঞানী ড. আখতার রহমান বলেন, “ভূমি অফিসে ঘুষ মানে শুধু অর্থের লেনদেন নয়—এটা মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, বিশ্বাস ও সম্মান বিক্রির এক প্রক্রিয়া। সাধারণ মানুষ বিচার পায় না, আর প্রশাসন নীরব থাকে—এটাই দুর্নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক।”

তিনি আরও বলেন, “যখন ভিডিওসহ প্রমাণ থেকেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, তখন সমাজে একটি বার্তা যায়—দুর্নীতি করেও টিকে থাকা সম্ভব।”

ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও রামচন্দ্রপুর ভূমি কর্মকর্তা বহাল তবিয়্যতে রয়েছেন—এটাই প্রমাণ করে যে দুর্নীতিবিরোধী প্রশাসনিক কাঠামো এখনো কার্যকর হয়নি। সহকারী কমিশনারের বক্তব্যও এই রহস্যের পর্দা আরও ঘন করেছে।

এখন প্রশ্ন একটাই—

“যখন প্রমাণ চোখের সামনে, তখনও যদি ব্যবস্থা না হয়, তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়বে কে?”