তোফায়েল পালালেও থামেনি বিতর্ক, নলতা কলেজে নতুন ‘ক্ষমতার কেন্দ্র’ আব্দুল্লাহ
স্টাফ রিপোর্টার:
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নলতা আহছানিয়া মিশন রেসিডেন্সিয়াল কলেজ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আবারও আলোচনায় এসেছে। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. রুহুল হকের কথিত ভাগ্নে ও বহুল বিতর্কিত অধ্যক্ষ তোফায়েল আহম্মেদ অনিয়ম-দুর্নীতি এবং স্বৈরাচারী আচরণের অভিযোগে কলেজ ছাড়তে বাধ্য হলেও তাঁর স্থলাভিষিক্ত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধেও উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিয়োগ বাণিজ্যসহ প্রায় কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ তোফায়েল আহম্মেদ এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিকীর ছেলে ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি কলেজের উপাধ্যক্ষ ও অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুসরণ না করে নানা কৌশলে প্রায় দুই বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি তাঁর একাডেমিক যোগ্যতা ও কলেজে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সূত্রমতে, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের ভিত্তিতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেলেও তাঁর স্নাতক (পাস) পর্যায়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয় ছিল না। প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নের জন্য স্নাতক পর্যায়ে ওই বিষয় থাকা প্রয়োজন। এ কারণে তাঁর স্নাতকোত্তর ডিগ্রির বৈধতা এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করেছে, মন্ত্রণালয়ের অডিটে বিষয়টি ধরা পড়লেও পরে প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তা ধামাচাপা দেওয়া হয়। যদিও এ অভিযোগের কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ তোফায়েল আহম্মেদকে পুনরায় স্বপদে বহাল করার জন্য একটি প্রভাবশালী চক্র তৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী এ প্রচেষ্টায় জড়িত। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এ লক্ষ্যে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ ও তদবিরও চলছে।
এ ধরনের গুঞ্জনে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন তোফায়েল আহম্মেদের বিরুদ্ধে পূর্বে অভিযোগকারী শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন এলাকাবাসী। তাঁদের আশঙ্কা, বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের চেষ্টা কলেজের শিক্ষার পরিবেশকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলবে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, “অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে হবে এবং উপাধ্যক্ষ পদের চাহিদাপত্র ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়া হবে। আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।”
তিনি আরও বলেন, “বিশেষ পরিস্থিতিতে আমি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোরও চেষ্টা করছি। অধ্যক্ষ তোফায়েল আহম্মেদকে পুনর্বহাল, আর্থিক লেনদেন কিংবা আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তার কোনো সত্যতা নেই।”
এ বিষয়ে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “আপনার কাছে যে তথ্য রয়েছে, তার সবগুলো সঠিক নয়। অধ্যক্ষ তোফায়েল আহম্মেদকে পুনর্বহালের চেষ্টা বিভিন্ন মহল থেকে হতে পারে। তবে বর্তমান কলেজ কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী, সেটি দেখার বিষয়। বর্তমানে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির নেই।”
তিনি আরও বলেন, “ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের যোগ্যতা বা নিয়োগের বিষয়টি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত। যেহেতু তিনি নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন, তাই তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়া যথাযথ হয়েছে বলেই আমি মনে করি।”
এ ঘটনায় কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।








