কালাইয়ে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল কালোবাজারে বিক্রি,জনতার বাধায় রক্ষা পেল ২০ মেট্রিক টন, চাল গেল এতিমের পাতে
সউদ আব্দুল্লাহ, কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি:
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দকৃত সরকারি চাল পাচারের সময় ৬৬৭ বস্তা চাল জব্দ করেছে উত্তেজিত জনতা। বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) সকালে উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের ঝামুটপুর এলাকার চান্দাইর দাখিল মাদ্রাসার পাশের একটি গুদাম থেকে চালগুলো মাত্রাই বাজারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এ সময় স্থানীয় লোকজন বিষয়টি সন্দেহজনক মনে করে চালবোঝাই ভ্যানগুলো আটক করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে বিষয়টি জানান।
খবর পেয়ে উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং অভিযুক্ত চাল ডিলার আশরাফ আলী, মাত্রাই বাজারের চাল ব্যবসায়ী আলী আহম্মেদ ও হাতিয়র বাজারের ব্যবসায়ী সোহরাব আলীকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে নিয়ে যান। একই সঙ্গে পাচারের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া চালগুলোও জব্দ করা হয়।
পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ঘটনার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তদন্তে সরকারি চাল বিক্রির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় ডিলার আশরাফ আলীকে ১০ হাজার টাকা, সোহরাব আলীকে ১৫ হাজার টাকা এবং আলী আহম্মেদকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এদিকে, জব্দ করা চাল সুবিধাভোগীদের মাঝে বিতরণের পরিবর্তে উপজেলার বিভিন্ন এতিমখানায় হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার সকাল থেকেই ডিলার আশরাফ আলী সুবিধাভোগীদের মাঝে চাল বিতরণের কথা বললেও, তিনি তাদের চাল না দিয়ে প্রতিজনকে ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা করে দেন। পরদিন বৃহস্পতিবারও চাল দেওয়ার কথা থাকলেও তা আর দেওয়া হয়নি। বরং চালগুলো সরাসরি বাজারে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।এই খবর পেয়ে স্থানীয়রা চালবাহী ভ্যানের পেছনে পেছনে গিয়ে চালগুলো আটক করে। চাল আটকের ঘটনার সঙ্গে জড়িত বোড়াই গ্রামের বাসিন্দা সাজ্জাদুর রহমান জানান, তিনি ও আরও কয়েকজন মিলে মাত্রাই বাজারের আলী আহম্মদের গুদামে গিয়ে চালগুলো আটকে ইউএনওকে খবর দেন।
সুবিধাভোগী ছফির উদ্দিন ও আব্দুল হান্নানসহ আরও অনেকে জানান, তারা এবার চাল না পেয়ে ৯০০ টাকা পেয়েছেন এবং বলা হয়েছে চাল বরাদ্দ নেই। অথচ পরবর্তীতে জানা যায়, সেই চাল গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছিল। এনামুলের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, চাল না পেয়ে ওই টাকায় বাজার থেকে ৫৮ টাকা কেজি দরে মাত্র ১৫ কেজি চাল কিনতে হয়েছে, যা দিয়ে চলা অসম্ভব। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বারবার গরিবের পেটে লাথি মারা হয়, এর বিচার হয় না। আমি এই ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানাই।
এ বিষয়ে আহম্মেদাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল বাসেদ জানান, ওই ইউনিয়নের চাল স্থানীয়ভাবে বিতরণ করার কথা থাকলেও তা বাইরে নিয়ে যাওয়া কেন হলো, সে বিষয়ে ডিলার তাকে কিছুই জানায়নি।
ডিলার আশরাফ আলী দাবি করেন, তিনি চাল বিতরণের পর সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে চালগুলো কিনেছেন এবং চালের পরিবর্তে টাকা দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। তবে উপজেলা প্রশাসনের কাছে এসব ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হয়নি।
উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক মাহমুদুন নবী বলেন, সরকারি চাল ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো সুযোগ নেই, এ ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ অবৈধ। কোনোভাবেই এই চাল ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামিমা আক্তার জাহান জানান, খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন,মজুত, স্থানান্তর, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণন আইন ২০২৩" এর ৬ নম্বর ধারায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকারি চালের অপব্যবহার কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।









