ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্যে জমির উর্বর অংশ যাচ্ছে ইট ভাটায়
মোঃ আসাদুজ্জামান, বিশেষ প্রতিনিধি :
ঝিনাইদহ জেলা জুড়ে দিন দিন বেড়েই চলেছে ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য। বিপরীতে, জেলা প্রশাসন প্রায়ই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে করছে জরিমানা। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য শক্তির বলে আবারো সরব হয়ে উঠছে ভূমিদস্যুরা। কেউ কেউ প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে কৃষি জমির অতি উর্বর অংশ (টপ সয়েল) ও পুকুর খনন করে মাটি বিক্রি করছেন ইট ভাটায়। কেউবা ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা, পুলিশ ও সাংবাদিকসহ স্থানীয় নেতাদের ম্যানেজ করে চালিয়ে নিচ্ছেন ব্যবসা। আর এতে ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ ট্রলি যুক্ত ট্রাক্টর। যেগুলো প্রতিনিয়ত ঘটাচ্ছে ভয়ানক সড়ক দুর্ঘটনা। প্রাণ হারাচ্ছে শিশু থেকে শুরু করে নানা বয়সী সাধারণ মানুষ। কেউ কেউ হচ্ছেন পঙ্গু।
ফলে, এ-সকল অবৈধ যানবাহনের অবাধ চলাচলে বিনষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়ক। সম্প্রতি, জেলার ছয়টি উপজেলাতেই ফুটে উঠেছে একই চিত্র।
এদিকে, ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বোরো মৌসুমের ভরা সময়েও থেমে নেই মাটি খেকোদের দৌরাত্ম্য। জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু অসাধু মাটি খেকো দানব জমির উর্বর অংশ কেটে ইট ভাটায় বিক্রি করছে। ফলে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি জমি। প্রতিনিয়ত কমছে উৎপাদন ক্ষমতা। অপরদিকে, এসব মাটি বহনে ব্যবহার হচ্ছে অবৈধ ট্রলি যুক্ত ট্রাক্টর। উচ্চ শব্দে মাটি ভর্তি এসব দানব গাড়ি অবাধে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গ্রামের মেঠোপথ থেকে শুরু করে সড়ক-মহাসড়ক। দিনের চেয়ে রাতের বেলায় বেশি সক্রিয় এসব মাটি খেকো ব্যবসায়ীরা। জেলা প্রশাসন প্রায়ই অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেও, অন্তরালে থাকা অদৃশ্য শক্তির বলে পার পেয়ে যাচ্ছে এসকল মাটি খেকোর দল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন মাটি ব্যবসায়ী জানান,
বিগত বছরগুলোর মতো এবছরও স্থানীয় ভূমি কর্মকর্তা, পুলিশ, সাংবাদিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে, তারা করছেন মাটি বিক্রির ব্যবসা। অনেকেই বলেছেন, টাকা দিলে ভালো, না দিলে হতে হয় হয়রানি। বেশি ঝামেলা করে পুলিশ ও কিছু নামধারী সাংবাদিক।
এ-বিষয়ে একজন মাটি ও বালু ব্যবসায়ী জানান,
সবাইকে টাকা দিয়ে কাজ করতে হয়। টাকা নিয়ে বিভিন্ন আশ্বাস-প্রশ্বাস দিলেও, দিনশেষে দায়িত্ব নিতে চায় না কেউই। তবে, ভ্রাম্যমাণ আদালত এলে, আগে থেকেই তথ্য জানিয়ে শেষ উপকারটা তারা করেন। এখন নতুন নতুন ব্যবসায়ী তৈরি হয়েছে। তারা সবাই অমুক নেতা, তমুক নেতার নাম ভাঙিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে। তাদের দাপটে আমাদের মত পুরোনো ব্যবসায়ীরা অসহায়।
জমির টপ সয়েল কাটা নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ঝিনাইদহের সহকারী পরিচালক মোঃ মুন্তাছির রহমান বলেন,
"কৃষি জমির টপ সয়েল রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও প্রান্তিক কৃষকদের নিয়ে বেশ কয়েকবার ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামও করা হয়েছে। তবে, এতকিছুর পরেও এ-বিষয়ে কৃষকদের সদিচ্ছা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।"
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঝিনাইদহের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোঃ কামরুজ্জামান জানান,
কৃষি জমির সিংহভাগ পুষ্টি উপাদান থাকে টপ সয়েলে। কিছু অসাধু ব্যক্তি টপ সয়েল কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এতে করে, জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। জমি হারাচ্ছে উৎপাদন ক্ষমতা। জমির টপ সয়েল রক্ষায় কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রতিনিয়ত সচেতন করা হচ্ছে।
এদিকে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃষি জমির টপ সয়েল রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণ কে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তথ্য পেলে সাথে সাথেই ব্যবস্থা গ্রহণেরও সরাসরি নির্দেশ রয়েছে।
তবে, এতকিছুর পরেও থেমে নেই ভূমিদস্যু মাটি খেকোর দল। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে একের পর এক কেটে চলেছে কৃষি জমির টপ সয়েল।








