অগ্নি নিরাপত্তায় ব্যবস্থাহীনতা, শিক্ষার্থীরা কী নিরাপদ

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:৪৫ পিএম
অগ্নি নিরাপত্তায় ব্যবস্থাহীনতা, শিক্ষার্থীরা কী নিরাপদ

রেদওয়ান আহাম্মেদ সাগর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় :

সম্প্রতি রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুলে একটি বিমান দুর্ঘটনার দেশজুড়ে বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা আবারও প্রশ্ন তুলেছিল আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কতটা নিরাপদ? সেখানে ছোট ছোট শিশুদের অসহায় চিৎকারে দগ্ধ হওয়ার দৃশ্য দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। তবে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে এমন দুর্ঘটনায় দ্রুত অগ্নিনির্বাপণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। এই একটি ঘটনা যেন আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে কঠিন এক বাস্তবতাই সামনে এনে দিয়েছে।

বাংলাদেশে প্রতিবছর শীতকালে শুষ্কতা সৃষ্টির ফলে বিভিন্ন সরঞ্জাম, পুরোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ, এবং গ্যাস লিকেজের মতো অব্যবস্থাপনা থেকে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে। এ সময় শুধু বস্তি বা বাজার নয়, অনেক স্কুল, কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ও ঝুঁকির মুখে থাকে।

তবে দেশের অন্যতম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এখনো পর্যন্ত অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। নতুন নতুন বহুতল হল, ডিপার্টমেন্ট ও অফিস ভবন গড়ে উঠলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সেই অর্থে দৃশ্যমান নয়। অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, আগুন লাগলে তাদের জীবন বাঁচানো “নিয়তির ওপর ছেড়ে দেওয়াই যেন একমাত্র ভরসা। 

ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো হলগুলো যেমন আল বেরুনী, মীর মশাররফ হোসেন, মাওলানা ভাসানী, ১০ নং ছাত্র হল, নওয়াব ফয়জুন্নেসা, বেগম খালেদা জিয়া, জাহানারা ইমাম হলসহ বাকি পুরোনো হলের কোথাও দৃশ্যমান অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র নেই। কোথাও কোনো ফায়ার অ্যালার্ম নেই, নেই পানির রিজার্ভ ট্যাংক বা হাইড্রেন্ট সিস্টেম। নতুন নির্মিত বহুতল আবাসিক ভবনগুলোতেও ফায়ার সেফটি সিস্টেম আংশিকভাবে স্থাপন করা হলেও, দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনেকেই জানেন না, কীভাবে এগুলো পরিচালনা করতে হয়। ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তা নিছক আনুষ্ঠানিকতার পর্যায়ে থেকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ভবনের ভেতরেই পর্যাপ্ত ইমার্জেন্সি এক্সিট বা ফায়ার এস্কেপ সিঁড়ি নেই।

দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী মাহির রায়ান নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে বলেন, ফায়ার সেফটির বিষয়টা সাধারণ প্রয়োজনীয়তার অন্তর্ভুক্ত আর প্রশাসনের উচিত এটি নিশ্চিত করা। বড়ো সমস্যা হলো হলগুলোতে যারা টপ ফ্লোরে থাকি কখনো যদি আগুন লাগে তাদের লাইফ সব থেকে বেশি রিস্কের মধ্যে থাকবে। ফায়ার সেফটির বিষয়টা ক্যাম্পাসের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে একটা আর আমার মনে হয় প্রশাসনের এই বিষয়টা গুরুত্ব দেওয়া উচিত আর আমি আশা করছি যে প্রশাসন এই বিষয়টা দ্রুত সমস্যার সমাধান করবে।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী মামুন বলেন, রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন জায়গায় দুর্ঘটনা হচ্ছে। বিশেষ করে ছয় তলার অধিক যে ভবনগুলো আছে, সেগুলোতে এই ঝামেলাগুলো বেশি মুখোমুখি হয় যেখানে আগুন লাগলে ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যদি না থাকে তাহলে সেটি এক ধরনের সংকট সৃষ্টি করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ছয়টি হল আছে যেগুলো ১০ তলা করে এবং অন্যান্য আগের যে হলগুলি আছে সেগুলোর কোনোটাতেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অতি দ্রুত এসব হলগুলো এবং অন্যান্য আবাসিক ভবন ছাড়াও অনাবাসিক এবং একাডেমিক ভবনগুলোতে দ্রুত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যোগ করবে।জাকসুতে ইসলামি ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের সমাজসেবা পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আরিফুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় অগ্নিনির্বাপণ যে ব্যবস্থাটা রয়েছে এটাকে উন্নত করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে এবং ফ্যাকাল্টির বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টগুলোতে যথাযথ অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র নেই। আর যে যন্ত্রগুলো রয়েছে সেগুলো পরিচালনার দায়িত্বরতরা যথাযথ দক্ষ না। আমাদের এখানে দেশের অন্যতম একটি বড়ো বিজ্ঞান গবেষণাগার রয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু সায়েন্স ফ্যাকাল্টিতে বিভিন্ন কেমিক্যালস রাখা হয়। আমাদের এখানে অনেকগুলো হল রয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করে ফায়ার এক্সটিংগুইশারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা জরুরি। পরিচালনার দায়িত্বরতদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অগ্নি নির্বাপণের ক্ষেত্রে একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন বিবেচনাযোগ্য। 

জাকসুতে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের সহ-সমাজসেবা (নারী) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কাজী মৌসুমি আফরোজ বলেন, মেয়েদের হলগুলা রয়েছে বা ফ্যাকাল্টিগুলা রয়েছে সেখানে অগ্নি নির্বাপক কোনো যন্ত্র নাই। যদি অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তখন আসলে অগ্নি নির্বাপক এই যন্ত্র না থাকার কারণে অনেক বড়ো কোন দুর্ঘটনার মধ্যে শিক্ষার্থীরা পড়তে পারে। এ বিষয়টিতে আমরা অবগত আছি। যদি সুযোগ হয় তাহলে আমি অবশ্যই এই সমস্যা সমাধানে কাজ করব।

বাংলাদেশে ফায়ার সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে ২৬ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বড়ো একটি অংশ ঘটে শীতকালে। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, রান্নাঘরের গ্যাস লিকেজ, অথবা অসাবধানতাবশত মোমবাতি বা কয়লা ব্যবহারের ফলে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। এইদিক বিবেচনা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত ছয়টি হলে কারিগরি দুর্বলতার কারণে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের মাধ্যমে আগুন লাগার সম্ভাবনা প্রকট।

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের স্টেশন থেকে যানজট না থাকলে জাহাঙ্গীরনগরে পৌঁছাতে বিশ থেকে পঁচিশ মিনিট সময় লাগে। তবে যানজট থাকলে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, “ নবনির্মিত ছয়টি হলের জেনারেটর রুমের সাথে ফায়ার এক্সটিংগুইশারের সাব-স্টেশন করা হলেও পুরোনো হলে এরকম কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। 

তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাপরিকল্পনায় প্রশাসন যদি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য একটি জায়গায় ফায়ার স্টেশনের অনুমোদন দেন তাহলে সেটি বাস্তবায়নে অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান এবং জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা বিভাগের অধ্যাপক মো. জিল্লুর রহমান বলেন, “ দুর্ঘটনা কমানোর জন্য নির্মাণে অগ্নি নিরাপত্তায় বিল্ডিং কোড এবং ফায়ার সার্ভিস আইনে অনুসরণ করতে হবে। অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা, দ্রুত জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ফায়ার এক্সিট, জরুরি নির্গমন পথ ও সাইনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নির্মাণ সঠিক হলেও আগুন লাগতে পারে, তাই বিদ্যমান কাঠামোগুলোর জন্য জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে অগ্নি সুরক্ষা বিষয়ক প্রশিক্ষণ, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবহার এবং ধোঁয়া শনাক্তকরণ যন্ত্রের (স্মোক ডিটেক্টর) সঠিক স্থাপনা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে বোঝানো প্রয়োজন। 

তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ফায়ার ড্রিল বা মহড়া আয়োজন করা দরকার। তা না হলে দুর্ঘটনার সময় আতঙ্কই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড়ো শত্রু।”

শিক্ষার্থীরা বলছেন, এখনই যদি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে বড়ো দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকে যায়। তাদের দাবি প্রতিটি হল, বিভাগ ও প্রশাসনিক ভবনে কার্যকর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ। বছরে অন্তত একবার ফায়ার ড্রিল আয়োজন। একটি স্থায়ী ফায়ার সার্ভিস পোস্ট বা স্টেশন স্থাপন। গ্যাস সংযোগ ও বৈদ্যুতিক তারের নিয়মিত পরিদর্শন।

অগ্নি নির্বাপণের বিষয়ে জাকসুর নির্বাচিত সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক আহসান লাবিব বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ পর্যন্ত সবগুলো বিভাগ ও অনুষদগুলোতে অগ্নি নির্বাপকের ব্যবস্থা করতে পারে নাই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে কথা বলে প্রত্যেকটা বিভাগে ফায়ার এক্সটিংগুইশার যন্ত্র আদায় করব। যাতে করে অগ্নি নির্বাপণের সুন্দর একটা ব্যবস্থা রাখা হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যে-কোনো ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখা যায়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ বলেন,

বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ছয়টি আবাসিক হলে যে সাবস্টেশন বা ট্রান্সফর্মার আছে সেই জায়গাগুলোতে ফায়ার এক্সটিংগুইশারের মাধ্যমে ফায়ার সেফটি ইনসিওর করা হয়েছে। কিন্তু হলগুলোর ক্যান্টিন এবং ডাইনিং এর গ্যাস সরবরাহের জায়গাগুলোতে ফায়ার সেফটি নেই। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিরেক্টর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালকের সাথে কথা বলি এবং এই বিষয়গুলো জিজ্ঞাসা করি। প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন (পিআইসি) কমিটি অধিকতর উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের সভায় তিনটি মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির প্রতিনিধিরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। তাদের জানাই, আমরা হলগুলোতে ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করতে চাই। আরডিপিপির অনুমোদন হলে সবগুলো হলেই অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।