‘টাকা চাই না, মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই’—রাজশাহীর বস্তিবাসীর আকুতি
ছবি: বিডি মেইল
ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী ব্যুরো
“আমরা টাকা-পয়সা চাই না, ৪২টি পরিবারের জন্য একটু আশ্রয়ের ব্যবস্থা করুন। আমরা শুধু পরিবার নিয়ে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই।” আবেগাপ্লুত কণ্ঠে রাজশাহীর বুধপাড়া রেলওয়ে বস্তির বাসিন্দা জাহেদা বেগমের এই আকুতিতে উঠে এসেছে নগরীর বস্তিবাসীর নিরাপদ আবাসনের অনিশ্চয়তা ও জীবনসংগ্রামের চিত্র।
আগামী ৩১ অক্টোবর ‘বিশ্ব নগর দিবস’ উপলক্ষে বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজশাহী নগরীর একটি রেস্তোরাঁর সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত নাগরিক সংলাপে বস্তিবাসী ও বক্তারা এ দাবি জানান। ‘শহরের পুনরুজ্জীবন: সকলের জন্য পর্যাপ্ত বাসস্থান’ শীর্ষক সংলাপের আয়োজন করে উন্নয়ন সংস্থা বারসিক।
সংলাপে বক্তারা বলেন, রাজশাহী নগরীর অন্তত ১০৪টি বস্তিতে বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষের নিরাপদ বাসস্থানের নিশ্চয়তা নেই। নগরীর শ্রমজীবী মানুষ—যাঁরা রিকশা চালানো, রাজমিস্ত্রি ও গৃহস্থালির কাজ করে শহরের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখেন, তাঁদের অনেকেই বস্তিতে সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, চিকিৎসাকেন্দ্র ও শিশুদের খেলার মাঠের মতো মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
বর্ষায় পানিতে প্লাবিত হওয়া, সাপ-পোকামাকড়ের উপদ্রব এবং যেকোনো সময় উচ্ছেদের আশঙ্কার মধ্যে তাঁদের দিন কাটে।
চৌদ্দপাই বস্তির বাসিন্দা পাপিয়া সুলতানা ও বহরমপুর বস্তির মো. মতিয়ার শেখ অভিযোগ করেন, ভোটের সময় তাঁদের নাগরিক হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হলেও পরে পুনর্বাসন বা মৌলিক সুবিধার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয় না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলার সভাপতি আহমেদ সফিউদ্দিন বলেন, “বস্তিবাসীকে বাদ দিয়ে কোনো টেকসই নগর গঠন সম্ভব নয়। উন্নয়নের নামে উচ্ছেদের আগে অবশ্যই পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি সরকারি খাসজমি চিহ্নিত করে বস্তিবাসীদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প গ্রহণ অথবা গৃহনির্মাণ ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান। পাশাপাশি রাজশাহী সিটি করপোরেশনে (রাসিক) একটি বিশেষ গবেষণা সেল গঠন করে নগরীর শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের আহ্বান জানান।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ছোট্ট স্বপ্ন’-এর সাধারণ সম্পাদক মো. রকি আলী এবং সামাজিক স্কুলের সাধারণ সম্পাদক ফাতেমা-তুজ-জোহরা বলেন, নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষকে না জানিয়ে হঠাৎ উচ্ছেদ করা অমানবিক। উচ্ছেদ বন্ধ করে তাঁদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাসিক, আরডিএ ও স্থানীয় সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
নগর দরিদ্র অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব নিলুফার ইসমত আরার সভাপতিত্বে আয়োজিত সংলাপে সঞ্চালনা করেন বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান। মূল গবেষণা নীতিপত্র উপস্থাপন করেন বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ও নৃবিজ্ঞানী মো. শহিদুল ইসলাম।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন রুলফাওয়ের নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন, নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী, রাসিকের নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সাকিবুর রহমান এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাহিদুর রহমানসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, বস্তিবাসীদের প্রতি করুণা নয়, বরং নাগরিক হিসেবে তাঁদের আবাসন ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।









