সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে শিক্ষক সংকট, ব্যাহত সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান

প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম
সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে শিক্ষক সংকট, ব্যাহত সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান

সূত্রঃ সংগৃহীত

শাহীন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি


কুড়িগ্রামের রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে তীব্র শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান। কলেজটিতে ৬০টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৮ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৩২টি পদ। সবচেয়ে বেশি সংকট বিজ্ঞান বিভাগে। এ বিভাগে ১২টি শিক্ষকের পদ থাকলেও বর্তমানে কোনো শিক্ষক নেই।


দীর্ঘদিনের জনবল সংকটের পাশাপাশি প্রশাসনিক দুর্বলতা ও আর্থিক নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে গত ৮ জুন ২২তম বিসিএসের ক্যাডার অধ্যাপক মো. জহুরুল হক স্থায়ী অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের পর প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


কলেজ সূত্রে জানা গেছে, অধ্যক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানের ৩৩টি ব্যাংক হিসাবের মধ্যে ১৬টিতে অর্থ পাওয়া যায়। কয়েকটি হিসাবে কোনো অর্থ ছিল না। একটি চলতি হিসাবে ছিল মাত্র ৩০০ টাকা। একই সময়ে অতিথি শিক্ষক ও মাস্টাররোল কর্মচারীদের দুই মাসের বেতনও বকেয়া ছিল। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেই বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে।


বিজ্ঞান বিভাগে সবচেয়ে বেশি সংকট


শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় ১২ জন নতুন অতিথি শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনজন অতিথি শিক্ষক পাঠদান করছেন। শিক্ষক ছাড়াও গ্রন্থাগারিক, শরীরচর্চা শিক্ষক ও প্রদর্শক পদেও জনবল সংকট রয়েছে।


কলেজের প্রভাষক সাহেব আলী বলেন, ৬০টি শিক্ষক পদের মধ্যে ৩২টি শূন্য থাকায় নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম শেষ করতেও সমস্যা হচ্ছে।


প্রভাষক তপতি রানী বলেন, শিক্ষক সংকটের প্রভাব বিজ্ঞান বিভাগে সবচেয়ে বেশি। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় পাঠদান ও ব্যবহারিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ব্যবহারিক কক্ষও অব্যবহৃত ছিল। এতে আসন থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি কমছে এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব ফলাফলেও পড়তে পারে।


দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সিরাতুন বিনতে বুশরা বলেন, “বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েও শিক্ষক সংকটের কারণে মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু মানবিক বিভাগেও ইংরেজিসহ কয়েকটি বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় আছি।”


প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ


নতুন অধ্যক্ষ যোগদানের পর শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও একাডেমিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষককে মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতিও নিয়মিত নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।


প্রভাষক সংগীতা রানী বলেন, প্রশাসনিক কাজে শৃঙ্খলা ফিরেছে। রেজিস্টার, ক্যাশবই ও চেকবইসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে।


অবকাঠামোগত উন্নয়নেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে ফ্যান সংযোজন, সিসিটিভি স্থাপন, ল্যাব সংস্কার, সীমানাপ্রাচীর ও ছাত্রীদের বাথরুম মেরামতসহ পুরোনো ভবনের বিভিন্ন অংশ সংস্কারের কাজ চলছে।


অতিথি শিক্ষক চৌধুরী রিংকু র‌্যাবেন বলেন, অধ্যক্ষ যোগদানের সময় দুই মাসের বেতন বকেয়া ছিল। বর্তমানে সেই বেতন পরিশোধ করা হয়েছে।


সহকারী অধ্যাপক সাজেদুর রহমান মন্ডল বলেন, দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ায় প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা ও নিয়ম-শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।


কলেজ কর্মচারী নিতাই চন্দ্র রায় বলেন, এখন নিয়মিত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মীর মুহঃ হাবিবুল্লাহর সময়কার শৃঙ্খলার কথা মনে পড়ে।


১৯৭৩ সালে যাত্রা শুরু


১৯৭৩ সালে মীর মুহঃ হাবিবুল্লাহর উদ্যোগে কলেজটির যাত্রা শুরু হয়। ২০০০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়। ২০১৮ সালে কলেজটি সরকারি করা হলেও স্থায়ী অধ্যক্ষ না থাকায় প্রশাসনিক ও একাডেমিক নানা সমস্যা দীর্ঘদিন বহাল ছিল।


বর্তমানে কলেজটিতে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি, স্নাতক এবং ছয়টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু রয়েছে।


শনিবার (২৯ আগস্ট) কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. জহুরুল হক বলেন, “কলেজে অনেক সমস্যা রয়েছে। শিক্ষক সংকট নিরসনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতিথি শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা চলছে। শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও স্থানীয় সুশীল সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন।”