রাবিতে শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষকরা

প্রকাশিত: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম
রাবিতে শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষকরা

সূত্রঃ ফাইল ছবি

রাবি প্রতিনিধি


২০২৪ সালের ১ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিন দেশজুড়ে গণগ্রেফতার, দমন-পীড়ন ও আন্দোলন দমনের নানা উদ্যোগের মধ্যেও শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শিল্পী ও সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। একই দিনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হেফাজত থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক মুক্তি পান। অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাদা পোশাকে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শিক্ষার্থীদের তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের সামনে মানববেষ্টনী গড়ে দাঁড়িয়ে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।


১ আগস্ট মুক্তি পাওয়া ছয় সমন্বয়কের মধ্যে তিনজন ছয় দিন, দুজন পাঁচ দিন এবং একজন চার দিন ডিবি কার্যালয়ে ছিলেন। মুক্তির পর সমন্বয়ক সারজিস আলম ফেসবুকে লিখেছিলেন, ছয়জন সমন্বয়ককে আটকে রাখা সম্ভব হলেও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে আটকে রাখা যাবে না। গণগ্রেফতার ও নির্যাতন চললে আন্দোলনও চলবে।


একই দিনে রাজধানীতে সব হত্যাকাণ্ডের বিচার, গণগ্রেফতার ও নির্যাতন বন্ধের দাবিতে দেশের বিশিষ্ট শিল্পীরা মানববন্ধনের কর্মসূচি পালন করেন। জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে কর্মসূচিতে বাধা পেয়ে তারা খামারবাড়ি থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত বৃষ্টির মধ্যেই প্রতিবাদ জানান। সেদিনই সরকার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়।


কক্সবাজারেও আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নয় দফা দাবির সমর্থনে শহরের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে। কয়েক ঘণ্টার শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো শহর। পরে আন্দোলনে অংশ নেওয়া অভিভাবক আয়ুবুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করে জানান, সন্তানদের আন্দোলনে যেতে নিষেধ করলেও শেষ পর্যন্ত নৈতিক দায়বোধ থেকে তিনিও রাজপথে নেমেছিলেন। ওই সময় পর্যন্ত কক্সবাজারে দায়ের হওয়া সাতটি মামলায় ৭৫ জন গ্রেফতার হন এবং প্রায় দেড় হাজার মানুষকে আসামি করা হয়।


জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ শীর্ষক কর্মসূচি পালিত হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবী চত্বরে চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ, আহতদের প্রতি সংহতি এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকও সেখানে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।


চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী হাবিব বলেন, দেশের চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের ওপর যে নির্যাতন চলছে, সেটিই তারা শিল্পের ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।


দিনটির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে শিক্ষক নেটওয়ার্কের উদ্যোগে আয়োজিত মৌন মিছিলকে কেন্দ্র করে। মুখে লাল কাপড় বেঁধে শিক্ষকরা ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করেন। মিছিল শেষে শহীদ বুদ্ধিজীবী চত্বরে ফিরে এলে সাদা পোশাকে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে জোর করে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় শিক্ষকরা দ্রুত শিক্ষার্থীদের ঘিরে মানববেষ্টনী তৈরি করেন। পরিস্থিতি একপর্যায়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদে কাজলা গেট পর্যন্ত পৌঁছে দেন।


এর আগের রাতেই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থীকে নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হয়। খবর পেয়ে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা গভীর রাতেই সংশ্লিষ্ট থানায় ছুটে যান এবং শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে অবস্থান নেন। দীর্ঘ আলোচনার পর মতিহার থানায় আটক তিন শিক্ষার্থী প্রায় সাড়ে নয় ঘণ্টা পর মুক্তি পান। অন্যদের মুক্তির দাবিতেও শিক্ষকরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। শিক্ষকদের এই অবস্থান শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাহস ও আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে।


মৌন মিছিলে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা ড. আমীরুল ইসলাম কনক বলেন, ১ আগস্ট ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবেকের পরীক্ষা। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, সাংবিধানিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে শিক্ষকরা রাজপথে নেমেছিলেন। শিক্ষার্থীদের জোর করে তুলে নেওয়ার চেষ্টা হলে শিক্ষক হিসেবে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, মানববেষ্টনী গড়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষকরা শুধু কয়েকজন শিক্ষার্থীকে রক্ষা করেননি, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন চেতনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক আস্থা এবং প্রতিবাদের ঐতিহ্যকেও রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, সেদিন ক্যাম্পাসে থমথমে পরিবেশ ছিল এবং শিক্ষার্থীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেকে বিভিন্ন পথ দিয়ে কর্মসূচিতে যোগ দেন। কর্মসূচি শেষে সাদা পোশাকধারী সদস্যরা শিক্ষার্থীদের ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে শিক্ষকরা বাধা দেন। তিনি বলেন, তাদের সামনে থেকে শিক্ষার্থীদের তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে এই ঘটনা দেশজুড়ে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দেয় এবং আন্দোলনের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।