নতুন ভিসানীতি ২০২৬: ওভারস্টেতে জরিমানা, বিনিয়োগে এনভিআর

প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম
নতুন ভিসানীতি ২০২৬: ওভারস্টেতে জরিমানা, বিনিয়োগে এনভিআর

সূত্রঃ সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


বিদেশিদের বাংলাদেশে প্রবেশ, অবস্থান, ভিসা নবায়ন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন বিধান চালু করেছে সরকার। ‘ভিসা পলিসি-২০২৬’-এ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবৈধভাবে অবস্থানের জন্য ধাপে ধাপে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে স্পনসর প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা এবং ৫০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগে বিদেশি উদ্যোক্তাদের ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ (এনভিআর) সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।


নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রথম ১৫ দিন প্রতিদিন এক হাজার টাকা, এরপর প্রতিদিন দুই হাজার টাকা এবং ৯০ দিনের বেশি ওভারস্টে করলে প্রতিদিন তিন হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় অবৈধভাবে অবস্থান করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।


তবে অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা বা ফ্লাইট বাতিলের মতো অনিবার্য কারণে অবস্থানের মেয়াদ বাড়লে জরিমানা মওকুফের সুযোগ থাকবে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিক, বাংলাদেশি নাগরিকের বিদেশি স্বামী বা স্ত্রী ও সন্তানদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্তে জরিমানা মওকুফ করা যেতে পারে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত জরিমানা মওকুফের সুযোগ রয়েছে।


ভারত-পাকিস্তানের নাগরিকদের নিবন্ধন


ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকদের জন্য নতুন নীতিতে আলাদা নিবন্ধন বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এ দুই দেশের নাগরিকেরা ৯০ দিন বা তার বেশি মেয়াদের ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করলে ১৪ দিনের মধ্যে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন করতে হবে।


৩০ দিনের ভিসা অন অ্যারাইভাল


নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের নাগরিকদের পর্যটন ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের একবার প্রবেশযোগ্য ভিসা অন অ্যারাইভাল দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর আওতায় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা থাকবেন।


এ ছাড়া ট্রানজিট ভিসার সর্বোচ্চ মেয়াদ ৭২ ঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফি ২০ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। ভিসার মেয়াদ বাড়াতে হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করতে হবে।


৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগে এনভিআর


বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও নতুন নীতিতে এনভিআর সুবিধার সুযোগ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে ভারী শিল্প বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায় অন্তত ৫০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে বিদেশি উদ্যোক্তারা এ সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের সনদ জমা দিতে হবে।


তবে বিনিয়োগকারীর পরিচয়, ব্যবসার ধরন ও অর্থের উৎস যাচাই করা হবে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিক বা তাদের পরিবারের কেউ বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পেয়ে থাকলে এনভিআর দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার ইতিবাচক প্রতিবেদন প্রয়োজন হবে।


বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকদের পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্তে তাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের বংশধর, স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানদেরও এনভিআর সুবিধা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।


স্পনসর প্রতিষ্ঠানের জরিমানা


কর্মসংস্থান, ব্যবসা, বিনিয়োগ বা শিক্ষার উদ্দেশ্যে আসা কোনো বিদেশি নাগরিক ভিসা আবেদনে তথ্য গোপন করলে বা ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী বা স্পনসর প্রতিষ্ঠানকেও জরিমানার মুখে পড়তে হবে। প্রথমবারের জন্য জনপ্রতি এক লাখ টাকা এবং পরবর্তী প্রতিবার সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে।


বিদেশি সাংবাদিকদের চলচ্চিত্র বা তথ্যচিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। নির্মাণকাজ চলাকালে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মনোনীত প্রতিনিধির উপস্থিতি এবং দেশ ছাড়ার আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র জমা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।


নিরাপত্তা প্রতিবেদনে ২১ কর্মদিবস


ভিসা ইস্যু বা মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রতিবেদন প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অনুরোধ পাওয়ার পর সর্বোচ্চ ২১ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন না এলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আপত্তি নেই ধরে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তবে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এ ধরনের নিরাপত্তা মতামত প্রয়োজন হবে না।


নতুন নীতিমালা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে আগের ভিসা-সংক্রান্ত সার্কুলারগুলো বাতিল হবে। তবে পুরোনো নীতির আওতায় ইস্যু করা ভিসা মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বৈধ থাকবে। নীতিমালার ব্যাখ্যা, সংশোধন বা কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে রাখা হয়েছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নীতিমালায় একদিকে অবৈধ অবস্থান ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারী ও নির্দিষ্ট শ্রেণির বিদেশিদের জন্য ভিসা সুবিধা সহজ করা হয়েছে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশি পর্যটক, বিনিয়োগকারী ও সাংবাদিকদের যেন অযথা হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।



এমকে/বিএম২৪