বুটেক্সের সনাতনী শিক্ষার্থীদের ভাবনায় আসন্ন দুর্গাপূজা

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০২ পিএম
বুটেক্সের সনাতনী শিক্ষার্থীদের ভাবনায় আসন্ন দুর্গাপূজা

ফাইল ছবি

বুটেক্স প্রতিনিধি


শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর শিশিরভেজা ভোরে শিউলি ফুলের সুবাস জানান দিচ্ছে, মা আসছেন। ঢাকের তালে তালে ফিরে আসছে শৈশবের স্মৃতি, নতুন পোশাকের গন্ধ, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ আর প্রিয়জনের কাছে ফেরার টান। বয়স বাড়ে, ব্যস্ততা বাড়ে, বদলে যায় উৎসব উদ্‌যাপনের ধরন; তবু দুর্গাপূজা এলেই মন ফিরে যায় আপন ঠিকানায়।


বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি পরিবার, স্মৃতি, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা। পড়াশোনার ব্যস্ততা পেছনে ফেলে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে পূজার ঐতিহ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে উৎসবটির জন্য অপেক্ষা করছেন তাঁরা।


‘পরিবারের উষ্ণতায় কাটুক দুর্গোৎসব’


চট্টগ্রামের রাউজানে গ্রামের বাড়িতে প্রায় ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। এবারও ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে বাড়িতেই পূজা উদ্‌যাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উচ্চশিক্ষার জন্য পরিবারের অনেক সদস্য বিদেশে থাকায় আগের মতো সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া যায় না। তাঁদের অনুপস্থিতিতে বাড়িটা কিছুটা ফাঁকা লাগে।


দিবাঞ্জলি ধর মনে করেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে পূজার ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে জানা এবং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও আধ্যাত্মিক দিক উপলব্ধি করা প্রয়োজন। দেবীর কাছে তাঁর প্রার্থনা, পরিবারের সবাই যেন সুস্থ ও ভালো থাকেন। পাশাপাশি বাবা-মায়ের প্রত্যাশা পূরণ করতে নিজেকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি।


দিবাঞ্জলি ধর

শিক্ষার্থী, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ৪৮তম ব্যাচ।


 ‘পূজা মানে মিলনের সুযোগ’


দুর্গাপূজা মানেই পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার সুযোগ। সিটি অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশনের চাপ ভুলে পূজার পাঁচ দিন ঘুরে বেড়ানো এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোই তনুশ্রী দের এবারের মূল পরিকল্পনা।


ছোটবেলায় নতুন পোশাক কেনা, মার্কেটে যাওয়া ও পাড়ায় পাড়ায় প্রতিমা দেখার আনন্দ ছিল আলাদা। সময়ের সঙ্গে ব্যস্ততা বেড়েছে, বদলেছে আনন্দের ধরনও। এখন নিজের আনন্দের চেয়ে পরিবারের সবার সঙ্গে তা ভাগ করে নেওয়াতেই বেশি তৃপ্তি খুঁজে পান তিনি।


দেবীর কাছে তাঁর প্রার্থনা, সবার জীবনে শান্তি, সুস্থতা ও নিরাপত্তা বজায় থাকুক। পরিবারের সবাই ভালো থাকুক এবং চলতি সেমিস্টারটি ভালোভাবে শেষ হোক।


তনুশ্রী দে

শিক্ষার্থী, অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ৫১তম ব্যাচ।


‘ঢাকের শব্দে ফিরে আসে শৈশবের স্মৃতি’


পূজার মূল আনন্দ পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো। মহাষ্টমীর অঞ্জলি, মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন, আলোকসজ্জা উপভোগ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে আড্ডায় কেটে যায় পূজার দিনগুলো। ছোটবেলার উচ্ছ্বাসের ধরন বদলালেও ঢাকের শব্দ, শিউলি ফুলের সুবাস আর শারদীয়ার আগমনী বার্তা আজও ফিরিয়ে নিয়ে যায় পুরোনো স্মৃতিতে।


অন্তর রায়ের মতে, নতুন প্রজন্মকে পূজার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে হলে শুধু মণ্ডপে ঘোরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ধুনুচি নাচ, ঢাক বাজানোসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রবীণদের কাছ থেকে পূজার ইতিহাস জানার সুযোগও তৈরি করা প্রয়োজন।


দেবীর কাছে তাঁর প্রার্থনা, পৃথিবী থেকে বিবাদ, হিংসা ও অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটুক। সবার জীবনে সুখ, শান্তি, সুস্বাস্থ্য ও সম্প্রীতি বজায় থাকুক।


অন্তর রায়

শিক্ষার্থী, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ৫০তম ব্যাচ।


‘ঐতিহ্য রক্ষায় চাই পূজার প্রকৃত তাৎপর্যের চর্চা’


এবারের পূজায় পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটানোর প্রত্যাশা প্রীতিশ সেনের। বন্ধুদের সঙ্গে রাতভর মণ্ডপ ঘুরে বেড়ানো, গল্প করা ও সুস্বাদু খাবার উপভোগ করার মধ্যেই পূজার বিশেষ আনন্দ খুঁজে পান তিনি।


তবে বয়স ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে ছোটবেলার সেই চিন্তামুক্ত উচ্ছ্বাস এখন অনেকটাই কমেছে। পূজার ধর্মীয় চেতনা ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে নতুন প্রজন্মকে এর প্রকৃত তাৎপর্যের সঙ্গে পরিচিত করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে গান-বাজনা ও উদ্‌যাপনের নামে ঐতিহ্যবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থেকে পূজার সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও জরুরি।


দেবীর কাছে তাঁর প্রার্থনা, পরিবারের সবার মঙ্গল হোক এবং পৃথিবী থেকে সব অমঙ্গল দূর হয়ে মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করুক।


প্রীতিশ সেন

শিক্ষার্থী, অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ৫২তম ব্যাচ।


‘পুরোনো রীতিতেই টিকে থাকুক পূজার আমেজ’


দুর্গাপূজা বছরের সবচেয়ে আনন্দের সময়গুলোর একটি। ছোটবেলায় বাজি ফোটানো ও ঢাক বাজানোর আনন্দ থাকলেও বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততা বেড়েছে। এবার বন্ধুদের সঙ্গে সপ্তমী পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখার পর গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে পূজা উদ্‌যাপনের পরিকল্পনা নীলদাস জয়ের।


দীর্ঘদিনের ইচ্ছা, পরিবারের সবাইকে নতুন পোশাক কিনে দেওয়া। তাঁর মতে, পূজার ঐতিহ্য ধরে রাখতে ঢাক বাজানো ও পুথিপাঠের মতো পুরোনো রীতিনীতির চর্চা বাড়াতে হবে। আধুনিক আয়োজনের পাশাপাশি পূজার সাত্ত্বিক রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকেও জানতে হবে।


দেবীর কাছে তাঁর প্রার্থনা, সবাই সুস্থ থাকুক, দেশে শান্তি বজায় থাকুক এবং বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় এগিয়ে যাক।


নীলদাস জয়

শিক্ষার্থী, টেক্সটাইল মেশিনারি ডিজাইন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগ, ৪৯তম ব্যাচ।


 ‘দুর্গাপূজার আনন্দ সব সময়ই অন্যরকম’


দুর্গাপূজার আনন্দের ধরন বদলালেও আবেগ রয়ে গেছে আগের মতোই। পড়াশোনার কারণে বাড়ির বাইরে থাকায় পূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্য ও পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখার অপেক্ষায় থাকেন অরণ্য দাস।


ছোটবেলায় ঢাকের তালে মেতে ওঠা, আতশবাজি ফোটানো কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করার স্মৃতি আজও তাঁর মনে উজ্জ্বল। নতুন প্রজন্মের মধ্যে পূজার ঐতিহ্য ধরে রাখতে ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি সম্প্রীতি, সহযোগিতা ও মানবিকতার চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।


দেবীর কাছে তাঁর প্রার্থনা, যুদ্ধ, হিংসা, অন্যায় ও নির্যাতনমুক্ত শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ে উঠুক। মানুষে মানুষে বিভেদ কমে প্রত্যেকে যেন নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে।


অরণ্য দাস

শিক্ষার্থী, টেক্সটাইল মেশিনারি ডিজাইন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগ, ৪৮তম ব্যাচ।