বাঘায় বৃদ্ধাকে কুপিয়ে হত্যা, অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওসির বিরুদ্ধে

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২০ পিএম
বাঘায় বৃদ্ধাকে কুপিয়ে হত্যা, অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওসির বিরুদ্ধে

সংগৃহীত

ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী বাঘা প্রতিনিধি


রাজশাহীর বাঘায় জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে রুমানা বেগম (৫৯) নামে এক বৃদ্ধাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের আটক ও ছেড়ে দেওয়া, মামলার এজাহার তৈরি এবং পরবর্তী পুলিশি কার্যক্রম নিয়ে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে বাঘা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল হকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে।


গত ২০ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাঘা থানার কিশোরপুর কামারপাড়া গ্রামে এ হামলার ঘটনা ঘটে। নিহত রুমানা বেগম ওই গ্রামের কামাল মণ্ডলের স্ত্রী। হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ছয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৬ অক্টোবর তিনি মারা যান।


নিহতের ছোট ছেলে মোহন ইসলাম জনি (৩৫) অভিযোগ করেন, জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষ মোসারফ হোসেন রেন্টু (৫৫), বেল্লাল আহমেদ বিদ্যুৎ (২৭), মোছা. বিউটি (৫০) ও মোছা. সাবানা খাতুন (২৫) লোহার রড ও ধারালো কাঁচি দিয়ে তাঁর মায়ের মাথায় এলোপাতাড়ি আঘাত করেন। এতে তাঁর মায়ের মাথা থেঁতলে যায় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়।


তিনি বলেন, মাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে সাবানা খাতুন ধারালো কাঁচি দিয়ে তাঁর স্ত্রী শান্তার হাতে আঘাত করেন। একই সময় তাঁর বড় ভাই বুলবুল এগিয়ে গেলে রেন্টু ও বিদ্যুৎ রড এবং বাঁশের লাঠি দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। এতে বুলবুল জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।


পরে স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে রুমানা বেগমের অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসক তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। এদিকে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত বুলবুল বাকশক্তি হারিয়েছেন বলে দাবি পরিবারের।


নিহতের ছেলে জনির অভিযোগ, ঘটনার পর হামলায় জড়িত দুই নারী বিউটি ও সাবানা নিজ বাড়িতে আশ্রয় নেন। স্থানীয়রা তাঁদের অবরুদ্ধ করে পুলিশে খবর দেন। পরে বাঘা থানার ওসি, এসআই ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের আটক করে থানায় নিয়ে যান। তবে কয়েক ঘণ্টা পর সাবানাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।


পরিবারের আরও অভিযোগ, আহত বুলবুলকে বাদী করে তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী নয়, বরং নিজেদের মতো করে এজাহার তৈরি করে তাতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। রুমানা বেগম মারা যাওয়ার পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের অনুরোধ জানালেও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেন জনি।


নিহতের পুত্রবধূ শান্তা বলেন, ঘটনার দিন রেন্টু, বিদ্যুৎ, সাবানা ও বিউটি তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এ সময় শাশুড়িকে বাঁচাতে গেলে সাবানা কাঁচি দিয়ে তাঁর হাতে আঘাত করেন। পরে স্থানীয়রা বিউটি ও সাবানাকে আটক করে রাখেন এবং পুলিশকে খবর দেন।


অভিযুক্তদের ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে বাঘা থানার ওসি সিরাজুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আনোয়ারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে ফোন কেটে দেন।


পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে থানায় গিয়ে কথা বলতে বলেন। পরে থানায় গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাবানা কিশোরী হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর মা বিউটিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।


সাংবাদিকরা সাবানা খাতুনের বয়স ২৫ বছর এবং তিনি অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী—এমন তথ্য উল্লেখ করে তাঁকে কিশোরী হিসেবে বিবেচনার বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা সরাসরি কোনো উত্তর দেননি।


এ ছাড়া বিউটির জামিনসংক্রান্ত আদালতের রিকল দেখতে চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা। পরে রাতে হোয়াটসঅ্যাপে একটি রিকল কপির ছবি পাঠান তিনি। তবে ওই কপিতে আদালতের সুনির্দিষ্ট সিল বা সরকারি মোহর দৃশ্যমান না থাকায় নথিটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র রাজশাহী জেলা জজ আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে অনুসন্ধানী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত বিদ্যুৎ ও বাঘা থানার ওসি সিরাজুল হকের মধ্যে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক রয়েছে। তাঁর দাবি, এই সম্পর্কের প্রভাব কাজে লাগিয়ে অভিযুক্তরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। ঘটনার পরও বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ওসির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


এদিকে রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) এ বিষয়ে বলেন, আইনের দৃষ্টিতে আসামি শুধুই একজন অভিযুক্ত। তাঁর বয়স বেশি না কম, সেটি মুখ্য নয়। অপরাধে জড়িত কাউকে থানা থেকে সরাসরি ছেড়ে দেওয়ার আইনি সুযোগ নেই। কোনো আসামি শিশু বা কিশোর-কিশোরী হলে আইন অনুযায়ী পৃথক ও শিশুবান্ধব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।


তিনি আরও বলেন, নির্দিষ্ট মামলার নথিপত্র ও বিস্তারিত তথ্য তাঁর কাছে নেই। মামলার নম্বর ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পাঠানো হলে বিষয়টি বিস্তারিত খতিয়ে দেখে জানাতে পারবেন।


এদিকে বৃদ্ধার মৃত্যুর পরও মামলার কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ২৫ বছর বয়সী সাবানাকে কিশোরী দেখিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগেরও তদন্ত দাবি করেছেন নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা।


এ ঘটনায় পুলিশি ভূমিকা নিয়ে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পরিবারের অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


এদিকে ঘটনাটির বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে টানা তিন দিন প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার দাবি করেছে অনুসন্ধানী দল। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি সংবাদ প্রকাশ না করতে হুমকি-ধমকি ও অর্থের প্রলোভন দেখিয়েছেন। তবে এসব চাপ উপেক্ষা করে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে দলটি।


এমকে/বিএম২৪