তিন মাস ধরে পাথর আমদানি বন্ধ, কর্মহীন ৮ হাজার শ্রমিক-ব্যবসায়ী
সূত্রঃ বিডি মেইল
রতন ইন্তিসার, বকশীগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি
বছরের বড় একটি সময়জুড়েই বন্ধ থাকে আমদানি-রপ্তানি। পড়ে আছে পাথর ভাঙার শত শত ক্রাশার মেশিন। কর্মচাঞ্চল্যের বদলে ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরজুড়ে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। দীর্ঘদিন ধরে পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বন্দরের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার শ্রমিক ও ব্যবসায়ী। একই সঙ্গে সম্ভাব্য কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরের এমন চিত্রই এখন স্থানীয়দের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদুল আজহার ছুটিতে সাত দিনের জন্য বন্ধ হওয়ার পর প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম।
বন্দরসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাথরের সঙ্গে আসা মাটি ও বালুর ওপর শুল্ক, বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত চার্জ, ভারতের অংশে সড়কের বেহাল অবস্থা এবং ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে আমদানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব কারণে পাথর আমদানিতে লোকসানের আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন।
ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন ও বন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় পাঁচ মাস এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ছয় মাস বন্ধ ছিল এ বন্দরের আমদানি-রপ্তানি। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও এখন পর্যন্ত কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে বছরের উল্লেখযোগ্য সময় কার্যত অচল থাকছে সম্ভাবনাময় এই স্থলবন্দর।
বন্দর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে বন্দরের অবকাঠামো সচল রাখতে গুনতে হচ্ছে বিপুল অর্থ।
১৯৭৪ সালে ভারতের মেঘালয় সীমান্তের ধানুয়া কামালপুরে ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করে বন্দরটি। পরে ২০১৫ সালের ২১ মে এটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে উন্নীত হয়। ইমিগ্রেশন কার্যক্রম চালুর লক্ষ্যে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি না থাকায় সেই অবকাঠামোর কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না এলাকাবাসী।
এ বন্দর দিয়ে পাথর, কয়লা, চুনাপাথর, গবাদিপশু, মাছের পোনা, ফলমূল, গাছগাছড়া ও উদ্ভিদ, বীজ, গম, পেঁয়াজ, আদা, মরিচ, রসুন, কাঁচা সুপারি, কাঠ ও রাসায়নিক সারসহ প্রায় ৩৪ ধরনের পণ্য আমদানির অনুমোদন রয়েছে। তবে বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরে বন্দরটির কার্যক্রম মূলত পাথর আমদানিকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়ে আসছে। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ও পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় সেগুলোর আমদানিও কার্যত বন্ধ।
বন্দরের কার্যক্রমকে ঘিরে ধানুয়া কামালপুরসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছিল বড় ধরনের কর্মসংস্থান। পাথর ভাঙা, ট্রাক পরিবহন, পণ্য ওঠানো-নামানো, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব মানুষের আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে।
পাথর ভাঙা শ্রমিক খোকন মিয়া বলেন, “আমদানি বন্ধ থাকায় আমাদের কাজও বন্ধ। সংসার চালাতে গিয়ে ঋণ করতে হয়েছে। বাজার খরচ চালাতে পারছি না, কিস্তিও দিতে পারছি না। দ্রুত পাথর আমদানি শুরু না হলে পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে পড়তে হবে।”
পাথর ব্যবসায়ী মো. মাহফুজুল হক বলেন, “পাথরের সঙ্গে আসা মাটির ওপর শুল্ক এবং অতিরিক্ত চার্জের কারণে আমদানি করে ব্যবসায়ীরা লাভ করতে পারছেন না। এসব বিষয় বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা না করলে আমদানি চালু করা কঠিন। বন্দর বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ী ও শ্রমিক সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিকাশ দত্ত বলেন, “বছরের বেশির ভাগ সময়ই এখানে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকে। তিন-চার মাস কাজ করে শ্রমিকদের পক্ষে সারা বছর সংসার চালানো সম্ভব নয়। পাথরের সঙ্গে বালু আসায় সেটিরও শুল্ক দিতে হয়। ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আমদানির আগ্রহ কমে যাচ্ছে।”
তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, আমদানি বন্ধের পেছনে ব্যবসায়ীদের লোকসানের আশঙ্কাই বড় কারণ। ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আবুল হোসেন আকন্দ বলেন, “ভারতীয় অংশে সড়ক সংস্কারের কাজ চলছে। এর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে বনিবনা না হওয়া এবং লোকসানের আশঙ্কায় আমদানি বন্ধ রয়েছে। আমরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছি এবং দ্রুত আমদানি চালুর জন্য তাদের বলা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আশা করছি দ্রুত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু হবে। তবে আগামী এক মাসের মধ্যে কার্যক্রম শুরু না হলে স্থলবন্দরটি বন্ধের সুপারিশ পাঠানোর নির্দেশনা রয়েছে।”
এ অবস্থায় স্থানীয়দের দাবি, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই স্থলবন্দর কার্যকর হয় না। আমদানি-রপ্তানির অনুকূল পরিবেশ তৈরি, শুল্ক জটিলতা কমানো, সীমান্তের সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা এবং ব্যবসায়ীদের সমস্যার সমাধান করে বন্দরটিকে নিয়মিত কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতে হবে। তা না হলে একদিকে যেমন হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হারিয়ে যাবে, তেমনি সরকারের রাজস্ব সম্ভাবনাও নষ্ট হবে।









