কিশোরগঞ্জ পৌর প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ভুয়া নিউজের মাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগ

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৮ পিএম
কিশোরগঞ্জ পৌর প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ভুয়া নিউজের মাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগ

সূত্রঃ সংগৃহীত

মো. মাহ্ফুজুল হক খান (জিকু), কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি

কিশোরগঞ্জ পৌরসভার উন্নয়নকাজে ৬১ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগে অডিট আপত্তি হয়েছে—সম্প্রতি এমন দাবি করে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও একটি পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ কম করে বিল উত্তোলন, নকশাবহির্ভূত নির্মাণ ও ভুয়া প্রাক্কলনের মতো অভিযোগ তোলা হয়।

তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অডিট আপত্তির দাপ্তরিক নথি খুঁজতে গিয়ে পৌরসভার সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোতে এর কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। ফলে ৬১ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পৌর প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ভুয়া নিউজের মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হয়েছে বলে উল্টো অভিযোগ উঠেছে।

গত ২৮ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টের বরাত দিয়ে পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়নকাজে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়। তবে সেখানে নির্দিষ্ট প্রকল্প, স্থান, ওয়ার্ড কিংবা অডিট আপত্তির স্মারক নম্বর উল্লেখ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে ৬৫ মিটার ড্রেন নির্মাণের পরিবর্তে ৫৫ মিটার নির্মাণ করে অতিরিক্ত ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়। তবে কোন ওয়ার্ডে, কোন প্রকল্পের আওতায় এবং কখন ওই ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে, সে তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

এ বিষয়ে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, বিগত সময়ে ৬৫ মিটারের নির্দিষ্ট কোনো ড্রেন প্রকল্পের তথ্য তাঁদের জানা নেই। মাঠপর্যায়ে জনগণের চাহিদা ও বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে কোনো কোনো কাজের দৈর্ঘ্যে কিছুটা কমবেশি হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের তথ্য ছাড়া এ ধরনের অভিযোগ বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

এ ছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্ডে ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকার স্লাব নির্মাণ এবং পুরোনো সড়কের নিচে সলিং দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে। পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. জুয়েল হক বলেন, এসব অভিযোগে কোনো ওয়ার্ড, প্রকল্প বা নির্দিষ্ট কাজের স্থান উল্লেখ করা হয়নি। শুধু আনুমানিক ভাউচারের কথা বলা হয়েছে। তাঁর দাবি, বর্তমান নির্মাণকাজের প্রক্রিয়া ও কারিগরি তদারকির কারণে এভাবে অনিয়ম করার সুযোগ নেই।

গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে জরুরি মেরামতকাজে প্রায় ৩১ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগও করা হয়। এ বিষয়ে সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, পৌরসভার দৈনন্দিন প্রয়োজন ও জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসক বা মেয়রের অনুমোদন নিয়ে নিয়ম মেনে ক্ষুদ্র ভাউচারের মাধ্যমে এসব কাজ করা হয়। এগুলোকে নিয়মিত টেন্ডারভুক্ত উন্নয়নকাজের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

পৌরসভার কর্মকর্তারা জানান, সরকারি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একাধিক পর্যায়ের কর্মকর্তা যুক্ত থাকেন। কাজের পরিমাণ ও বাস্তবায়নের হিসাব প্রথমে মাঠপর্যায়ে মেজারমেন্ট বুক (এমবি)-এ নথিভুক্ত করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী তা যাচাই করেন। পরবর্তী ধাপে নথি নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে যায় এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মেয়র বা প্রশাসকের কাছে উপস্থাপন করা হয়। ফলে কোনো কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট পুরো প্রক্রিয়া ও দায়িত্ব বণ্টন যাচাই করা প্রয়োজন বলে জানান তারা।

প্রকাশিত প্রতিবেদনের মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা অডিট আপত্তির বিষয়ে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা সৈয়দ শফিকুর রহমান বলেন, তিনি নতুন দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। এ ধরনের অডিট আপত্তির বিষয়ে তাঁর জানা নেই। বিষয়টি পূর্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভালো বলতে পারবেন।

পৌরসভার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা হাসান জাকিরও এ ধরনের অডিট আপত্তির বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, দাপ্তরিক নিয়ম অনুযায়ী অডিট আপত্তির চিঠি পৌরসভায় এলে তা হিসাব শাখায় নিবন্ধিত হওয়ার কথা।

পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম (মস্তান) বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থানীয় সরকার অডিট অধিদপ্তর থেকে যেসব অডিট আপত্তি এসেছে, সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করে জবাব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকৌশল শাখা-সংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অডিট আপত্তির কোনো চিঠি তাঁরা পাননি। পূর্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গেও কথা বলে এ ধরনের চিঠির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ বলেন, তিনি চলতি বছর কিশোরগঞ্জ পৌরসভায় অডিট করেছেন। তবে সংবাদে প্রকাশিত অডিট আপত্তিটি কোথা থেকে এসেছে, তা তাঁর জানা নেই।

অন্যদিকে, প্রকাশিত সংবাদে অডিট আপত্তির তথ্যের উৎস সম্পর্কে রূপালী বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম রাজন বলেন, তিনি তাঁর এক সহকর্মীর কাছ থেকে তথ্যটি পেয়ে প্রতিবেদন করেছেন। বিস্তারিত ওই সহকর্মী বলতে পারবেন বলে জানান তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ৬১ লাখ টাকার অডিট আপত্তির কথা বলে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ ধরনের কোনো অডিট আপত্তির কাগজপত্র এখনো তাঁর দপ্তরে আসেনি বলেও দাবি করেন তিনি।