আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস— এই দিনে দুই শিক্ষিকার বীরত্ব স্মরণ
মোঃ জাহেরুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার:
২০২৫ সালের ২১ জুলাই, সোমবার দুপুরে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শিক্ষকতার প্রকৃত অর্থ যেন নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হলো। সেদিন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি কলেজ ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে, আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু করে শিক্ষার্থীরা।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও অসীম সাহস আর মানবিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দেন দুই শিক্ষক — মাহরিন চৌধুরী ও মাসুকা বেগম। তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে ছুটে যান আগুনের ভেতর।
মাহরিন চৌধুরীর অবিশ্বাস্য সাহস:
দুর্ঘটনার সময় মাহরিন চৌধুরী ছিলেন ক্লাসে। আগুনের চিৎকারে যখন সবাই পালানোর চেষ্টা করছে, তখন তিনি ঠাণ্ডা মাথায় শিক্ষার্থীদের শান্ত করেন। একে একে ২০ জন শিক্ষার্থীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।
নিজে দগ্ধ হলেও দায়িত্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত থেমে যাননি। তার ভাই জানিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে মাহরিন বলেছিলেন,
“তারা-ও তো আমার সন্তান, তারা পুড়ছে, আমি কীভাবে তাদের ছেড়ে আসি?”
এই মানবিক বাক্যটি যেন শিক্ষকতার মহিমাকে নতুনভাবে তুলে ধরে — শিক্ষার্থীরা শুধু দায়িত্ব নয়, তারা নিজের সন্তানের মতোই।
মাসুকা বেগমের ত্যাগ:
অন্যদিকে, শিক্ষক মাসুকা বেগমও সাহসিকতার সঙ্গে আগুনের মধ্যে প্রবেশ করেন শিক্ষার্থীদের উদ্ধারের জন্য। তিনি গুরুতর দগ্ধ হন এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
তার অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগের কারণেই বহু শিক্ষার্থী প্রাণে বেঁচে যায়।
শিক্ষকতার মহিমা ও মানবিক দায়বদ্ধতা:
মাহরিন চৌধুরী ও মাসুকা বেগম প্রমাণ করেছেন — শিক্ষকতা শুধুমাত্র পাঠদান নয়; এটি এক মানবিক দায়িত্ব, ত্যাগ ও ভালোবাসার প্রতীক।
বিপদের মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা — এটাই প্রকৃত শিক্ষকতার মাহাত্ম্য।
তাদের সাহসিকতা আজকের প্রজন্মের জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এই দিনে তাদের স্মরণ করে বলা যায়, শিক্ষকরা কেবল জ্ঞানের আলো দেন না — প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের জন্য নিজেদের জীবনও উৎসর্গ করেন।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস সম্পর্কে:
প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়।
১৯৯৪ সালে ইউনেস্কো ও আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংস্থা যৌথভাবে দিবসটি প্রবর্তন করে, আর ১৯৯৫ সাল থেকে এটি উদযাপিত হচ্ছে।
ইউনেস্কোর মতে, এই দিবসের লক্ষ্য হলো — শিক্ষা ও উন্নয়নে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া, শিক্ষার মান উন্নয়নে তাদের ভূমিকা তুলে ধরা, এবং সমাজে শিক্ষক পেশার মর্যাদা বৃদ্ধি করা।
প্রতিবছর নানা আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় তাদের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
শিক্ষক দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি স্মরণ করিয়ে দেয় — শিক্ষকই সমাজের প্রকৃত দিশারী।









