বসুন্ধরা যেন রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র
ডেস্ক রিপোর্ট:
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ৭ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখনো বসুন্ধরা গ্রুপের হাতে। অনেকেই বলছেন, এলাকাটি যেন রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র। প্রথম আলো এলাকাটির অন্তত ১৫ জন জমির মালিক, ফ্ল্যাটমালিক, ভাড়াটে, আবাসন ব্যবসায়ী, জমির ক্রেতা ও কেনাবেচার মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা বলেছেন, সেখানে নিজেদের মতো করে নিয়ম তৈরি করে বসুন্ধরা গ্রুপ। এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান।
এলাকাটিতে ব্যক্তিমালিকের কাছ থেকে কেউ জমি কিনলে বসুন্ধরা গ্রুপের আবাসন কোম্পানিকে কাঠাপ্রতি ৫ লাখ টাকা বাড়তি দিতে হয়, যা জমির দাম ও সরকার নির্ধারিত করের বাইরে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের আগে এই টাকার পরিমাণ ছিল কাঠাপ্রতি ১০ লাখ। বসুন্ধরার ‘অনুগত’ মালিক সমিতি বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ফ্ল্যাটমালিকদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জও আদায় করে। আরও নানাভাবে টাকা নেওয়া হয় ফ্ল্যাট ও জমির মালিকদের কাছ থেকে।
প্রথম আলো এলাকাটির অন্তত ১৫ জন জমির মালিক, ফ্ল্যাটমালিক, ভাড়াটে, আবাসন ব্যবসায়ী, জমির ক্রেতা ও কেনাবেচার মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা বলেছেন, সেখানে নিজেদের মতো করে নিয়ম তৈরি করে বসুন্ধরা গ্রুপ। এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান।
রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, খেলার মাঠসহ নাগরিক সুবিধাদির নিয়ন্ত্রণও বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষের
রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, খেলার মাঠসহ নাগরিক সুবিধাদির নিয়ন্ত্রণও বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষেরছবি: প্রথম আলো
প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর আয়তনের এই এলাকায় গ্রুপটির নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী বাহিনী রয়েছে। সিটি করপোরেশন সেখান থেকে গৃহকর নিতে পারে না। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, খেলার মাঠসহ নাগরিক সুবিধাদির নিয়ন্ত্রণও সিটি করপোরেশনের হাতে নেই।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৬ সালের ২৮ জুন এই আবাসিক এলাকাকে সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশিত হয়। যদিও তখন গেজেট অনুযায়ী সেখানে সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এই চেষ্টা হয়েছিল। তবে সে সময় সরকার জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার শপথ নেয় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একটি সূত্র বলছে, মার্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দেশ দেন। এরপর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একটি প্রতিবেদন তৈরি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠায়।
সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, এলাকাটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে এলে বসুন্ধরা গ্রুপ অথবা বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি জমি ও ফ্ল্যাটমালিক এবং বাসিন্দাদের কাছ থেকে কোনো টাকা বা ফি নিতে পারবে না। মালিকেরা সরকার-নির্ধারিত গৃহকর দেবেন। নাগরিক সেবা দেবে সিটি করপোরেশন।
সর্বশেষ ৭ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব পাস হয়। ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ-সংক্রান্ত নথি অনুমোদন করেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকের একটি আলোচ্য বিষয় ছিল, ‘বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের প্রস্তাব উপস্থাপন।’
বৈঠকের (৭ মে) কার্যবিবরণীতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত লেখা হয়েছে, ‘ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গেজেটভুক্ত সব এলাকায় সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য সেবাদানকারী সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা স্ব স্ব আইন ও বিধি অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করিবে।’
২০১৬ সালের ২৮ জুনের গেজেটে বসুন্ধরা গ্রুপের কোম্পানি ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের আওতাধীন বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পভুক্ত বেরাইদ, বাড্ডা, ভাটারা এবং সাঁতারকুল ইউনিয়নের মৌজাগুলোকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, এলাকাটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে এলে বসুন্ধরা গ্রুপ অথবা বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি জমি ও ফ্ল্যাটমালিক এবং বাসিন্দাদের কাছ থেকে কোনো টাকা বা ফি নিতে পারবে না। মালিকেরা সরকার-নির্ধারিত গৃহকর দেবেন। নাগরিক সেবা দেবে সিটি করপোরেশন। সেখানে পুলিশের পৃথক থানা স্থাপন করা হবে। মাঠসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা উন্মুক্ত করা হবে
এসব বিষয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের বক্তব্য জানতে গতকাল বুধবার প্রথম আলোর পক্ষ থেকে লিখিতভাবে প্রশ্ন পাঠানো হয় প্রতিষ্ঠানটির মিডিয়া অ্যাডভাইজার আব্দুল বারীকে। উত্তরে তিনি মৌখিকভাবে বসুন্ধরা গ্রুপের বক্তব্য জানান। তিনি বলেন, গ্রুপের কর্তৃপক্ষ সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়টি সম্পর্কে জানে। তারা এ সিদ্ধান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। তা শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অবস্থান জানানো হবে।
কাঠাপ্রতি টাকা নেওয়ার বিষয়ে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ বলেছে, রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, সড়কবাতি, বৃক্ষরোপণসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্লটের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজের জন্য কিছু টাকা নেওয়া হয়। তবে সেটা এত বেশি নয়।
বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ আরও বলছে, বিষয়টি নিয়ে মালিকদের সংগঠন বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় নেওয়ার ক্ষেত্রে সময় চাওয়া হয়েছে।
বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষের দাবি, এর আগে রাজউকের সঙ্গে বসুন্ধরার একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী উন্নয়নকাজ শেষে ২০৩৪ সালে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাটি কোনো জনহিতকর প্রতিষ্ঠান, রাজউক অথবা আইনে যেভাবে বলা হয়েছে, সেভাবে হস্তান্তর করা হবে।
বসুন্ধরার এই দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার জানামতে এ ধরনের কোনো চুক্তি রাজউকের সঙ্গে হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। কারণ, এটা সিটি করপোরেশনের বিষয়। আমরা তাদের (বসুন্ধরা) চিঠি দিয়েছি যে তোমরা এটা বুঝিয়ে দাও সিটি করপোরেশনের কাছে। আমরা দুবার তাদের চিঠি দিয়েছি।’
কাঠাপ্রতি টাকা নেওয়ার বিষয়ে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ বলেছে, রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, সড়কবাতি, বৃক্ষরোপণসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্লটের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজের জন্য কিছু টাকা নেওয়া হয়। তবে সেটা এত বেশি নয়।
এদিকে বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালায় (২০০৪) বলা আছে, আবাসিক প্রকল্পের চূড়ান্ত লে-আউট প্ল্যান ও উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ বছরের মধ্যে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন যথাযথভাবে শেষ করতে হবে।
বসুন্ধরাকে প্রথম লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন দেওয়া হয় ১৯৮৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর। এরপর ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের প্রথম পর্বের (এ থেকে এল ব্লক) সংশোধিত ও সম্প্রসারিত লে-আউট প্ল্যান এবং দ্বিতীয় পর্বের (এম, এন, পি ও আই ব্লক) চূড়ান্ত লে-আউট প্ল্যান শর্ত সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর আবার ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই সংশোধিত ‘লে-আউট প্ল্যানের’ (প্রকল্পের নকশা) চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
নিয়ম হলো, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আবাসন প্রকল্পে প্লট বিক্রি করবে। তবে থানা, খেলার মাঠ, ধর্মীয় স্থাপনাসহ নানা ধরনের নাগরিক সুবিধার জন্য জমি রাখবে। প্রকল্প শেষে তা হস্তান্তর করবে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে। কিন্তু বসুন্ধরা সেটা না করে বারবার সংশোধিত লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন করে নিয়েছে। এদিকে রাজউকের গত ১৬ এপ্রিলের একটি স্মারকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার লে আউটে অবস্থিত নাগরিক সুবিধার জন্য সংরক্ষিত জমি সিটি করপোরেশনের কাছে জরুরি ভিত্তিতে হস্তান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মনে করছেন, আবারও সময় চাওয়া বসুন্ধরার সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল। তারা কখনোই এ এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করতে চাইবে না। এলাকাটি তাদের আয়ের একটি উৎস। আবাসিক এলাকাটিতে নির্মাণকাজে বসুন্ধরার নির্মাণসামগ্রী এবং রান্নায় তাদের কোম্পানির তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহার করতে হয়। সুপারশপ, যানবাহন সেবা, কেবল টিভি বা ডিশ, ইন্টারনেটসহ নানা ব্যবসা তারা ও তাদের ঘনিষ্ঠরা করে।
আমার জানামতে এ ধরনের কোনো চুক্তি রাজউকের সঙ্গে হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। কারণ, এটা সিটি করপোরেশনের বিষয়। আমরা তাদের (বসুন্ধরা) চিঠি দিয়েছি যে তোমরা এটা বুঝিয়ে দাও সিটি করপোরেশনের কাছে। আমরা দুবার তাদের চিঠি দিয়েছি
রাজউকের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম
গুগল ম্যাপে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা
গুগল ম্যাপে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা
১৯৮৭ সালে শুরু
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ঢাকার উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত। বসুন্ধরার মালিকানাধীন কালের কণ্ঠ পত্রিকার ফেসবুক পেজে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর প্রচারিত বসুন্ধরার একটি বিজ্ঞাপনী ভিডিও চিত্রে বলা হয়েছে, ১৯৮৭ সালে চারটি ব্লক দিয়ে যাত্রা শুরু করে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা। এখন ব্লকের সংখ্যা ২০। সেখানে ৫০ হাজারের বেশি পরিবার বসবাস করে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ (২০২২) অনুযায়ী, দেশে পরিবারের গড় আকার ৪ দশমিক ২। সে হিসাবে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জনসংখ্যা ২ লাখ ১০ হাজারের বেশি। সর্বশেষ লে-আউট প্ল্যান অনুযায়ী বসুন্ধরা প্রকল্পের আওতায় এখন জমি রয়েছে ৩ হাজার ৪০৪ একর। এর মধ্যে ৭৪ একর জমি ‘সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট’।
এই আবাসিক এলাকার একটি বড় অংশে ভবন হয়েছে। একাংশ এখনো খালি। প্রকল্পের আওতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বসুন্ধরার বিরুদ্ধে পেশি ও অর্থশক্তি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ২২ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এতে বসুন্ধরার চেয়ারম্যান আহমদ আকবর সোবহান বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের আগের ঘটনার বিচার হলে আজকে তারা সাহস পেত না। সবাই জানে কারা কারা এর সঙ্গে জড়িত।’ তিনি বলেন, ‘সাত দিন ব্যবসা বন্ধ থাকলে কিছু হবে না। এই সন্ত্রাসী জঙ্গিবাহিনীকে ধ্বংস করতে হবে, সে জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’
আগুন-সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়ে আহমদ আকবর সোবহান বলেন, ‘উনি (শেখ হাসিনা) আমাদের নেতৃত্ব দেবেন, ইনশা আল্লাহ কোনো শক্তি আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। নেতৃত্বের প্রতি আমাদের আস্থা-বিশ্বাস আছে, মৃত্যুর পরও আস্থা-বিশ্বাস থাকবে।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আহমদ আকবর সোবহান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগের তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত আহমদ আকবর সোবহান, তাঁর স্ত্রী আফরোজা বেগম, ছেলে সায়েম সোবহান আনভীর ও তাঁর স্ত্রী সাবরিনা সোবহান, আরেক ছেলে
সাদাত সোবহান ও তাঁর স্ত্রী সোনিয়া ফেরদৌস সোবহান এবং আরও দুই ছেলে সাফিয়াত সোবহান সানভীর ও সাফওয়ান সোবহানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন।
দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, আহমদ আকবর সোবহানের পরিবারের কয়েকজন সদস্য আগে থেকেই বিদেশে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে আহমদ আকবর সোবহান, তাঁর স্ত্রীসহ পাঁচজন বিদেশযাত্রার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন। সর্বশেষ গত ২৭ এপ্রিল ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজ এ আবেদন নাকচ করে দেন।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম ১৮ মে প্রথম আলোকে বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে দুটি মামলা হয়েছে। মামলা দুটির এখন তদন্ত চলছে।
এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার ও ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে টাকা পাচার ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে ‘যৌথ তদন্ত দল’ গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ১১ শিল্পগোষ্ঠীর অন্যতম বসুন্ধরা গ্রুপ.....
রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র
“ব্যক্তিগত জমি কেনাবেচার সময় ক্রেতার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়”
বসুন্ধরা যে নিজেদের মতো নিয়ম তৈরি করেছে, তার একটি বড় উদাহরণ—ব্যক্তিগত জমি কেনাবেচার সময় ক্রেতার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া।
বছর তিনেক আগে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একজন প্লটমালিকের কাছ থেকে সাড়ে ৭ কাঠার একটি প্লট কেনেন অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জমির কেনার সময় সরকারি করের বাইরে কাঠাপ্রতি তাঁকে ১০ লাখ টাকা করে দিতে হয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপকে। বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইস্ট ওয়েস্ট প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট থেকে সরাসরি জমি কিনলে এই টাকা লাগে না।
এদিকে বসুন্ধরায় জমি কেনাবেচার মধ্যস্থতাকারী ও ভবন নির্মাতা একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, জমি কেনার পর ক্রেতা নিজে ভবন নির্মাণ করতে চাইলে মোট দেড় লাখ টাকা দিতে হয় বসুন্ধরার ইস্ট ওয়েস্ট প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্টকে (যত কাঠাই হোক)। যদি ব্যক্তিমালিকানার জমি কোনো আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়, তাহলে বসুন্ধরা নেয় ২ লাখ টাকা।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যেহেতু এখনো সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেহেতু গৃহকর (হোল্ডিং ট্যাক্স) আদায় করতে পারে না করপোরেশন। অবশ্য বসুন্ধরার ফ্ল্যাটমালিকদের গৃহকরের মতো ‘সার্ভিস চার্জ’ দিতে হয়। বিভিন্ন সেবা দেওয়ার কথা বলে এই টাকা নেয় বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি।
সার্ভিস চার্জ আদায়ের একটি নোটিশে দেখা যায়, নিজের ফ্ল্যাটে নিজে থাকলে মাসে বর্গফুটপ্রতি সার্ভিস চার্জ ৬০ পয়সা, ভাড়াটের জন্য ৮০ পয়সা এবং বাণিজ্যিক স্থাপনার জন্য ১ টাকা ৮০ পয়সা। ফলে দেড় হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটে মালিক থাকলে বছরে প্রায় ১১ হাজার টাকা, ভাড়াটে থাকলে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার টাকা এবং বাণিজ্যিক স্থাপনার জন্য প্রায় সাড়ে ৩২ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
মনে হয় বসুন্ধরা আলাদা একটি দেশ, রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র। বসুন্ধরার লোকজন যা বলে, তাই করতে হয়; না করলে নানা ধরনের ঝামেলায় পড়তে হয়।
একজন বাসিন্দা
বাসিন্দারা বলছেন, ওয়েলফেয়ার সোসাইটি আসলে নিয়ন্ত্রণ করে বসুন্ধরা গ্রুপ। তাদের পছন্দের লোকদেরই সমিতির শীর্ষস্থানীয় পদে বসানো হয়। সমিতির বর্তমান সভাপতি কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হন।
মজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বসুন্ধরার ঘনিষ্ঠদের সমিতির শীর্ষ পদে বসানো হয়—এ কথা সঠিক নয়। এখানে নেতা হন নির্বাচনের মাধ্যমে। তিনিও নির্বাচনের মাধ্যমে হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, বসুন্ধরায় মানুষ দরজা খুলে ঘুমাতে পারে। চুরি-ডাকাতির ভয় নেই। সিটি করপোরেশন এভাবে চালাতে পারবে না। সিটি করপোরেশনের অধীনে গেলে দেখবেন দোকানে দোকানে ভরে গেছে। এখনকার পরিবেশ, সৌন্দর্যটা থাকবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, বসুন্ধরার বক্তব্য তাদের নিজস্ব। দীর্ঘদিন ধরে তারা এলাকাটি নিজেদের মতো করে পরিচালনা করছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে পরিবেশবান্ধব রেখেই সিটি করপোরেশন আগামী দিনে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে।
শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, বসুন্ধরাকে সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে আনাসংক্রান্ত চিঠিটি তাঁরা পেয়েছেন মঙ্গলবার। এখন করপোরেশনের বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করে কাজের পরিকল্পনা তৈরি করবেন।
বসুন্ধরায় মানুষ দরজা খুলে ঘুমাতে পারে। চুরি-ডাকাতির ভয় নেই। সিটি করপোরেশন এভাবে চালাতে পারবে না। সিটি করপোরেশনের অধীনে গেলে দেখবেন দোকানে দোকানে ভরে গেছে। এখনকার পরিবেশ, সৌন্দর্যটা থাকবে না।
সমিতির বর্তমান সভাপতি কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল
‘রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র থাকতে পারে না’
বাসিন্দাদের অনেকে মনে করেন, বসুন্ধরা পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ। আবার অনেকেই বলছেন, সেখানে নিরাপত্তার নামে বাড়াবাড়ি হয়, অপরাধমূলক ঘটনাও ঘটছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বসুন্ধরায় গত ৩১ ডিসেম্বর নাঈম কিবরিয়া (৩৫) নামের এক আইনজীবীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তখন পুলিশ বলেছিল, রাত ১০টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার) চালাচ্ছিলেন নাঈম। একপর্যায়ে একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে প্রাইভেট কারটির ধাক্কা লাগে। তখন মোটরসাইকেলের চালকসহ অজ্ঞাতপরিচয় যুবকেরা নাঈমকে প্রাইভেট কার থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় থাকেন, এমন একজন বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী বলেন, ‘লাইসেন্স ছাড়াই অনেক তরুণ-তরুণী এখানে গাড়ি চালান। দ্রুতগতির কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না।’ সম্প্রতি এক রিকশাচালকের মৃত্যুর ঘটনাও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয় বলে জানান তিনি।
বসুন্ধরার বাসিন্দাদের অনেকে বলছেন, নিরাপত্তার নামে বসুন্ধরা মূলত এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে। নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাধারণ বাসিন্দাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে যখন বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকপক্ষের কেউ রাস্তায় বের হন, তখন রাস্তা আটকে দিয়ে তাঁদের ‘ভিভিআইপি’র মতো প্রটোকল দেওয়া হয়।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় থাকেন, এমন একজন বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী বলেন, ‘লাইসেন্স ছাড়াই অনেক তরুণ-তরুণী এখানে গাড়ি চালান। দ্রুতগতির কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না।’ সম্প্রতি এক রিকশাচালকের মৃত্যুর ঘটনাও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয় বলে জানান তিনি।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্রবেশের পাঁচটি পথ রয়েছে। পূর্বাচল সড়ক দিয়ে প্রবেশের পথটি সব সময় খোলা থাকে। অন্য পথগুলো রাত ১২টার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ এলাকার একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, মনে হয় বসুন্ধরা আলাদা একটি দেশ, রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র। বসুন্ধরার লোকজন যা বলে, তাই করতে হয়; না করলে নানা ধরনের ঝামেলায় পড়তে হয়।
নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান নগর-পরিকল্পনাবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র থাকতে পারে না। প্রকল্পের উন্নয়নকাজ শেষ হলে সেটা যথাযথ সরকারি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিতে হয়। আইনে সেটাই আছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে সিটি করপোরেশনের অধীনে আনার উদ্যোগ নিয়ে সরকারও সেটাই করছে। বসুন্ধরা এলাকা এত দিন পর্যন্ত যে সিটি করপোরেশনের আওতার বাইরে আছে, সেটাই আইনের পরিপন্থী ও বিস্ময়কর।
সূত্র: প্রথম আলো








