হাইকোর্টে রেজিস্ট্রেশন বাতিল, বেরিয়ে এলো দীর্ঘদিনের বিতর্ক

প্রকাশিত: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৫ পিএম
হাইকোর্টে রেজিস্ট্রেশন বাতিল, বেরিয়ে এলো দীর্ঘদিনের বিতর্ক

‎মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

চট্টগ্রাম ওয়াসায় দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালানো ‘জাতীয়তাবাদী’ পরিচয়ে নিবন্ধিত একটি শ্রমিক সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন অবশেষে বাতিল করেছে হাইকোর্ট। রেজিস্ট্রেশন নম্বর ২৩০৭ধারী এই সংগঠনকে অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া রায়ে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে শ্রমিক রাজনীতির নানা বিতর্ক, অভিযোগ ও দ্বন্দ্ব নতুন করে সামনে এসেছে।

‎হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষে সংগঠনটির নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে। এর ফলে চট্টগ্রাম ওয়াসায় সংগঠনটির সকল সাংগঠনিক কার্যক্রমের আইনগত ভিত্তি বিলুপ্ত হয়েছে।

‎মামলার সূত্রপাত ২০০৪ সালে, যখন চট্টগ্রাম ওয়াসা শ্রমজীবী ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি রতন কান্তি দাশ একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন (মামলা নং ৬১০৯/২০০৪)। ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর আদালত সংগঠনটির কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

‎পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর আদালত কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে জানতে চায় কেন সংগঠনটির নিবন্ধন বাতিল করা হবে না। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালে চূড়ান্ত রায় আসে।

‎আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ধারা ১৭৯(৫) অনুযায়ী একটি প্রতিষ্ঠানে তিনটির বেশি ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন দেওয়া যায় না। সাম্প্রতিক শ্রম আইন (গেজেট প্রকাশ: ৯ এপ্রিল ২০২৬) একই বিধান পুনর্ব্যক্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনটি ওয়াসায় চতুর্থ ট্রেড ইউনিয়ন হওয়ায় সেটি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে বিবেচিত হয়।

‎রিট দায়েরকারী পক্ষের দাবি, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সংগঠনটি বিভিন্ন সময়ে পরোক্ষভাবে কার্যক্রম চালিয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।

‎অনুসন্ধানে জানা যায়, সংগঠনটির সভাপতি ও শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময়ে সরকারি দল ও সহযোগী সংগঠনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বলে একাধিক ছবি ও তথ্য পাওয়া গেছে। জাতীয় দিবস, রাজনৈতিক সমাবেশ, এমনকি দলীয় অনুষ্ঠানেও তাদের উপস্থিতির অভিযোগ রয়েছে।

‎স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এসব কর্মকাণ্ড সংগঠনটির ঘোষিত আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।

‎সংগঠনটির একাধিক নেতার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে। বিশেষ করে ওয়াসার একটি রাজস্ব সংশ্লিষ্ট শাখায় দায়িত্ব পালনকালে অবৈধভাবে বিপুল অর্থ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে এক নেতার বিরুদ্ধে।

‎যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছে বলে দাবি অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টদের।

প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের অবস্থান

‎চট্টগ্রাম ওয়াসা শ্রমজীবী ইউনিয়নের নেতারা বলছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে কাজ করে আসছেন।

‎তাদের অভিযোগ, বিতর্কিত সংগঠনটি প্রশাসনিক প্রভাব ও রাজনৈতিক আশ্রয়ে টিকে ছিল এবং প্রকৃত শ্রমিক রাজনীতির পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও শ্রমিক রাজনীতি

‎বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

‎এই রায়ের ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে শ্রমিক রাজনীতিতে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একটি সংগঠন প্রভাব বিস্তার করে টিকে ছিল?

সামনে কী?

‎রায়ের ফলে সংগঠনটির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হলেও এর প্রভাব পুরোপুরি শেষ হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

‎বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমিক সংগঠনগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

‎চট্টগ্রাম ওয়াসায় শ্রমিক রাজনীতির এই অধ্যায় তাই শেষ নয় বরং নতুন প্রশ্নের সূচনা।