রোগীর ভিড়ে দিশেহারা নোয়াখালী সদর হাসপাতাল, নতুন ভবন নির্মাণ কাজে শকুনের চোখ

প্রকাশিত: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
রোগীর ভিড়ে দিশেহারা নোয়াখালী সদর হাসপাতাল, নতুন ভবন নির্মাণ কাজে শকুনের চোখ

মোঃ মিজানুর রহমান সুমন, বেগমগঞ্জ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি:

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের মেঝেতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কেউ শুয়ে আছেন বারান্দায়, কেউবা সিঁড়ির পাশে। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ জন রোগী। ধারণক্ষমতার চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি রোগীর চাপে ভেঙে পড়েছে সেবা ব্যবস্থা। অথচ পাশেই ঝুলে আছে নবনির্মিত ৫০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল প্রকল্পের ভাগ্য। অদৃশ্য কোনো অপশক্তির ইশারায় আটকে আছে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ—তা নিয়ে এখন সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাস।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে বেডের চেয়ে মেঝের রোগীর সংখ্যা বেশি। বেডের অভাবে একটি সিঙ্গেল বেডে দুইজন করে রোগীকে রাখা হচ্ছে। নার্স ও চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন এই বিপুল জনস্রোত সামলাতে। একজন চিকিৎসককে যেখানে ২০ জন রোগী দেখার কথা, সেখানে তাকে দেখতে হচ্ছে শতাধিক।

নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা রোগীর স্বজন বলেন, “মানুষ বিপদে পড়ে হাসপাতালে আসে, কিন্তু এখানে এলে মনে হয় নরকে আছি। মেঝেতে থাকার জায়গা নেই, টয়লেটে লাইন। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটা চালু হলে কি এমন হতো?”

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে নোয়াখালীসহ আশপাশের কয়েক জেলার মানুষের চিকিৎসা সেবায় বিপ্লব ঘটত। প্রকল্পটিতে যা পাওয়ার কথা ছিল:

• শয্যা সংকট নিরসন: হাসপাতালের সক্ষমতা দ্বিগুণ হওয়ার ফলে রোগীদের মেঝেতে বা বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নেওয়ার অমানবিক পরিস্থিতি বন্ধ হবে এবং অধিক সংখ্যক রোগী ভর্তির সুযোগ পাবে।

• বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা: হৃদরোগ, নিউরোলজি, অর্থোপেডিক্স ও শিশু রোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো আলাদা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় রোগীরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সরাসরি তত্ত্বাবধান পাবে।

• জরুরি জীবনরক্ষা (ICU ও CCU): আধুনিক ও বর্ধিত ধারণক্ষমতার আইসিইউ এবং সিসিইউ সুবিধা নিশ্চিত হবে, ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের ঢাকা পাঠানোর বিড়ম্বনা ও পথেই মৃত্যুঝুঁকি কমবে।

• উন্নত ডায়াগনস্টিক ও সার্জারি: সরকারি খরচেই সিটি স্ক্যান (CT Scan), এমআরআই (MRI) এবং আধুনিক ল্যাব সুবিধা পাওয়া যাবে। সেই সাথে উন্নত অপারেশন থিয়েটারের মাধ্যমে জটিল অস্ত্রোপচার জেলাতেই সম্ভব হবে।

• প্রসূতি ও নবজাতকের নিরাপত্তা: উন্নত মা ও শিশু সেবা কেন্দ্র এবং এনআইসিইউ (NICU) সুবিধার ফলে ঝুঁকিপূর্ণ প্রসবের ক্ষেত্রে অন্য জেলায় রেফার করার হার কমে আসবে এবং মা-শিশুর মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস পাবে।

অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ মহলের স্বার্থ অথবা প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে এই বিশাল প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখছে না। নোয়াখালীর সচেতন মহলের মতে, এই হাসপাতালটি শুধু একটি ভবন নয়, এটি ৩৫ লাখ মানুষের বাঁচার অধিকার। যারা ক্ষমতার জোরে এই উন্নয়ন আটকে রেখেছেন 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের সীমাবদ্ধতা পাহাড়সম। ২৫০ শয্যার জনবল দিয়ে প্রায় ১৩০০ রোগীকে সেবা দেওয়া অমানবিক। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি চালু হলে জনবল বাড়বে, বিশৃঙ্খলা কমবে এবং মানুষ প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা পাবে।”

নোয়াখালীর সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর একটাই দাবি—সরকার যেন অবিলম্বে সব আমলাতান্ত্রিক ও স্বার্থান্বেষী বাধা অপসারণ করে দ্রুততম সময়ে ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু করে। ৩৫ লাখ মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে আর কতদিন চলবে এই অবহেলা?