জলাবদ্ধতা দেখতে চট্টগ্রামে প্রতিমন্ত্রী, ‘ভাসছে না শহর’ মন্তব্যে বিতর্ক
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণে দুই দিনের সফরে চট্টগ্রাম সফর করেছেন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। সফরের দুই দিনজুড়ে তিনি নগরীর জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ খাল এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন, সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের তাগিদ দেন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তবে তার কিছু বক্তব্যকে ঘিরে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
সফরের প্রথম দিন (২৯ এপ্রিল) প্রতিমন্ত্রী নগরীর প্রবর্তক মোড়, আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন জলাবদ্ধ এলাকা ঘুরে দেখেন। স্থানীয়দের ভোগান্তির চিত্র প্রত্যক্ষ করার পাশাপাশি তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক করণীয় বিষয়ে আলোচনা করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম শহর পানির ওপর ভাসছে না। অতিবৃষ্টির কারণে সাময়িকভাবে কিছু এলাকায় পানি জমেছিল, যা দ্রুত নেমে যাচ্ছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ হলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জলাবদ্ধতা সমস্যার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে খালের নাব্যতা হারানো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং খাল দখল ও বর্জ্য ফেলা। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
তবে প্রতিমন্ত্রীর “ভাসছে না শহর” মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই দাবি করেন, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থেকে জনদুর্ভোগ তীব্র আকার ধারণ করে, যা সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক নির্দেশ করে। সাধারণ মানুষ বলেন, অল্প সময়ের ভারী বর্ষণেই সড়ক ডুবে যায়, যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে।
সফরের দ্বিতীয় দিন (৩০ এপ্রিল) প্রতিমন্ত্রী নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিভিন্ন খাল, বিশেষ করে হিজড়া খাল পরিদর্শন করেন। তিনি খাল খনন, সংস্কার এবং দখলমুক্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং সংশ্লিষ্টদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন। এ সময় তিনি বলেন, “যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে কোনো ধরনের গাফিলতি সহ্য করা হবে না। কাজের মান বজায় রাখতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।”
তিনি আরও জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। স্বল্পমেয়াদে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, খাল পুনরুদ্ধার ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ সময় প্রতিমন্ত্রী সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “সমন্বয়ের অভাব থাকলে কোনো প্রকল্পই কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারে না। তাই সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”
এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যা দীর্ঘদিনের। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই একই দুর্ভোগে পড়তে হয় নগরবাসীকে। অনেক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি জমে থাকে, যার ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। তারা মনে করেন, শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয়, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
দুই দিনের সফর শেষে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সরকারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে বাস্তব পরিস্থিতি ও সরকারি বক্তব্যের মধ্যে ব্যবধান থাকায় চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কার্যকর তদারকি, দখলমুক্ত খাল এবং আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার বাস্তবায়নই পারে এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে নগরবাসীকে মুক্তি








