হাজার কোটি টাকার কর্ণফুলী টানেল: আয় ব্যয়ের অর্ধেক, বাড়ছে ভর্তুকির চাপ
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম সড়ক টানেল প্রত্যাশিত হারে ব্যবহার হচ্ছে না। উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পরও সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় যে পরিমাণ যান চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার মাত্র ১৪ শতাংশ টানেল ব্যবহার করছে। ফলে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকার ঘাটতি গুনতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। বছরে এই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু টোল বাড়িয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। বরং আনোয়ারা অঞ্চলে শিল্পায়ন, বন্দরভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে।
পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক কম যান চলাচল
কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পতেঙ্গার সঙ্গে আনোয়ারাকে সরাসরি যুক্ত করে নদীর দুই তীরকে সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করা। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর, কক্সবাজার ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও ছিল। সরকারের বহুল আলোচিত ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিল এই টানেল।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজার ৩৫০টি যানবাহন টানেল ব্যবহার করার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার যানবাহন চলাচল করছে। অর্থাৎ পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ৮৬ শতাংশ কম যানবাহন টানেল ব্যবহার করছে।
আয় ১২ লাখ, ব্যয় ২২ লাখ
বর্তমানে টানেল থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ লাখ টাকা টোল আদায় হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, ইলেকট্রোমেকানিক্যাল যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক ব্যয়সহ দৈনিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ২২ লাখ টাকা। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টোল থেকে অর্জিত আয় পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ পূরণ করতে পারছে। বাকি অর্থ সরকারকে ভর্তুকি হিসেবে বহন করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
টোল বাড়ালেও সমাধান নয়
আইএমইডি টোল বৃদ্ধির সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করেছে। তবে তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, টোল বাড়ানো হলে ব্যবহারকারীর সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কর্ণফুলী টানেলের ক্ষেত্রে মূল্যভিত্তিক চাহিদার স্থিতিস্থাপকতা অনেক বেশি। প্রতিবেদনের ভাষ্য, প্রকল্পটিকে আর্থিকভাবে লাভজনক করতে যে পরিমাণ যানবাহনের প্রয়োজন, তা বর্তমান বাস্তবতার তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি।
এ ছাড়া সম্ভাব্য প্রধান ব্যবহারকারী হিসেবে বিবেচিত পণ্যবাহী ট্রাকের বড় অংশ এখনো বিকল্প সড়ক ব্যবহার করছে। ফলে টানেলের ওপর পণ্য পরিবহনের নির্ভরশীলতা তৈরি হয়নি।
ব্যয় বেড়ে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা
শুরুতে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। পরে দ্বিতীয় দফা সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায়, যা মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে চীন সরকারের ঋণ ৬ হাজার ৭৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৪ হাজার ৬১২ কোটি ১২ লাখ টাকা।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রতিদিন ১৭ হাজার ৩৭৫টি যানবাহনের ভিত্তিতে টোল আয়কে আর্থিকভাবে লাভজনক হিসেবে ধরা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছিও পৌঁছানো যায়নি। ফলে প্রকল্পটির বার্ষিক নেট নগদ প্রবাহ এখনো ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি বদলাতে পারে
তবে আইএমইডি মনে করছে, মাত্র তিন বছরের কার্যক্রমের ভিত্তিতে এত বড় অবকাঠামো প্রকল্পের চূড়ান্ত আর্থিক মূল্যায়ন করা সমীচীন হবে না। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় এ ধরনের প্রকল্পের প্রকৃত অর্থনৈতিক কার্যকারিতা মূল্যায়নে ২০ থেকে ৩০ বছর সময় বিবেচনা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনোয়ারা অঞ্চলে শিল্পায়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বন্দর সম্প্রসারণ এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পুরোপুরি চালু হলে টানেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে ২০৪৩ অথবা ২০৫৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ রিটার্ন হার (ইআইআরআর) ইতিবাচক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
কিছু ইতিবাচক প্রভাবও আছে
আইএমইডির মূল্যায়নে টানেলের কিছু ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। বর্তমানে প্রতিদিন চার হাজারের বেশি যানবাহন টানেল ব্যবহার করে গড়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় সাশ্রয় করছে। এই সময় সাশ্রয়ের আর্থিক মূল্য প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২৫ লাখ টাকা।
এ ছাড়া আনোয়ারা অঞ্চলে নগরায়নের গতি বেড়েছে, পতেঙ্গা ও পারকি সৈকতে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে।
কী সুপারিশ করেছে আইএমইডি
প্রতিবেদনে কর্ণফুলী টানেলের ব্যবহার বাড়াতে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে
আনোয়ারা প্রান্তে বন্দরভিত্তিক শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা,
কর্ণফুলী ড্রাইডক, চায়না ইপিজেড ও কোরিয়ান ইপিজেডের উন্নয়ন দ্রুত সম্পন্ন করা,
চট্টগ্রাম বন্দরের আনোয়ারা অংশে পণ্য খালাস কার্যক্রম সম্প্রসারণ,
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে কার্যকর সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করা,
টানেলের দুই প্রান্তে লজিস্টিক ও বাণিজ্যিক হাব গড়ে তোলা,
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সংযোগ উন্নত করা,
পণ্যবাহী ট্রাককে টানেল ব্যবহারে উৎসাহিত করার নীতিমালা গ্রহণ,
ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) চালু এবং
সার্ভিস এরিয়াকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্ণফুলী টানেলের উদ্বোধন করেন। চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় নির্মিত এই টানেল দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নদীর তলদেশের সড়ক টানেল হিসেবে পরিচিত। উদ্বোধনের সময় এটিকে দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর এক যুগান্তকারী সংযোজন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। তবে আইএমইডির সর্বশেষ মূল্যায়ন বলছে, প্রকল্পটি এখনো কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।









