চোখের সামনেই বিলীন হচ্ছে টিকে থাকার অস্তিত্ব
আবদুল্লাহ আল নওশাদ, কুতুবদিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে। চারদিক বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত এই দ্বীপটি দীর্ঘদিন ধরে টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে ভয়াবহ উপকূলীয় ভাঙনের মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বড়ঘোপ ইউনিয়নের রোমাইপাড়া ও আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গ্রাম সাইট পাড়া এলাকায় বঙ্গোপসাগরে বিলীন হচ্ছে মানুষের বাড়ি ঘর, এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চলছে ভাঙ্গনের তান্ডব, ভাঙ্গনের কবলে পড়ছে ঘরবাড়ি, মসজিদ, ফসলি জমিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্হাপনা।
বড়ঘোপ রোমাই পাড়ার বাসিন্দা আজিজুল হক বলেন,জোয়ারের তীব্র স্রোতে আমার চোখের সামনেই ঘরটা নদীতে ধসে পড়ে। বহু বছরের কষ্টে গড়া সবকিছু মুহূর্তেই হারিয়ে ফেলেছি। এখন পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। দ্রুত স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সরকারি সহায়তা না পেলে আমাদের মতো অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে।
বড়ঘোপ রোমাই পাড়া ও আলী আকবর ডেইলের সাইট পাড়ার বাসিন্দা আছিয়া বেগম, ছালেহা বেগম, মামুনুর রশীদ ও সাইফু হকসহ বেশ কয়েক জনের সাথে কথা হলে তারা জানান, প্রতিটি জোয়ারের সঙ্গে নদী আমাদের বসতভিটা গিলে খাচ্ছে। ঘরবাড়ি, গাছপালা ও সহায়-সম্বল হারিয়ে আমরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে, আবার কেউ খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমরা দ্রুত স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি সরকারি সহায়তার দাবি জানাচ্ছি।"
উপজেলার আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নে ভাঙনের কবলে পড়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ঝুঁকির মুখে রয়েছে ঐতিহাসিক বাতিঘর, সি-বিচসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
দ্বীপের চারপাশে প্রায় ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অধিকাংশ অংশ ভাঙা বা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে অন্তত ১০ থেকে ১২টি গ্রাম সরাসাসরি হুমকির মুখে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কুতুবদিয়া উপজেলা কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘কুতুবদিয়ায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। নতুনভাবে ৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। শিগগিরই এসব স্থানে মেরামতকাজ শুরু করা হবে বলে জানান।
কুতুবদিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘বেড়িবাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা আমরা একাধিকবার পরিদর্শন করেছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে বাঁধের ভাঙা অংশ দ্রুত সংস্কারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
দ্বীপের প্রায় ২ লাখ মানুষ প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম এলেই দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। প্রতি বছর আমাবস্যার জোয়ারে প্লাবিত হয় ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, বাজার ও প্রধান সড়ক।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো এই দ্বীপে টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে গত ৩৪ বছরে বিলীন হয়েছে ১৮৩ একর জনপদ।
স্হানীয়দের অভিযোগ , বিগত সরকারের সময় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য টেন্ডার হলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে বালি ও কাদা মাটির জিওব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বেড়িবাঁধ নির্মাণের নামে বিপুল অর্থ লুটপাট হলেও কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা পায়নি দ্বীপটি।
স্হানীয়দের দাবি , প্রতিবছর বালি ও কাদা মাটির জিওব্যাগ দিয়ে সাময়িকভাবে বেড়িবাঁধ রক্ষার চেষ্টা করা হলেও তা টেকসই সমাধান নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের যৌক্তিক দাবি
যৌথ বাহিনীর তত্ত্বাবধানে কুতুবদিয়ার চারদিকে স্থায়ী ‘সুপার ডাইক’ বা টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ।








