গুমের ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের দাবি, সংশোধনের আহ্বান দুই বিলে

প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম
গুমের ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের দাবি, সংশোধনের আহ্বান দুই বিলে

সূত্রঃ সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


মানবাধিকার ও গুমসংক্রান্ত প্রস্তাবিত দুই বিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও সাবেক গুম কমিশনের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, স্বাধীন তদন্তের সুযোগ নিশ্চিত না করে বিল দুটি পাস করা হলে গুমের ঘটনায় বিচার ও জবাবদিহি আরও কঠিন হয়ে পড়বে।


আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এ সভার আয়োজন করে। এতে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।


সভায় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ—দুই আইনেই স্বতন্ত্র তদন্তপ্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, তদন্তের বর্তমান প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন না আনলে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে।


সারা হোসেন বলেন, “নিজের বিচার কখনো নিজে করা যায় না।” তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী কোনো দেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এখন সংসদের স্থায়ী কমিটি আইন দুটি নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত কতটা গুরুত্ব দেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।


আদালতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, অতীতে গুমের ঘটনায় আদালতের কাছে যাওয়া অনেকেই কার্যকর প্রতিকার পাননি। এবার সরকার ও আদালত জবাবদিহির সুযোগ তৈরি করে কি না, সেটিও বড় পরীক্ষা।


সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গুমের ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা থাকা জরুরি। বাহিনীর কাছ থেকে তথ্য নেওয়া বা তাদের মাধ্যমেই অনুসন্ধানের ব্যবস্থা রাখা হলে কমিশন কার্যত নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।


তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশনকে যদি কার্যকর তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া না হয়, তাহলে এমন আইন থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।


‘গুমের পথকে সুগম করবে’


ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার মীর আহমাদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান) বলেন, বর্তমান সংসদে মজলুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। অথচ তাঁদের হাত দিয়েই এমন একটি আইন পাস হতে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে গুমের পথ আরও সহজ করে দিতে পারে।


আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সুবিধার কথা বিবেচনা করে আইন প্রণয়ন করা হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করাই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অন্যতম দায়িত্ব।


তিনি বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনীকে খুশি করা আপনাদের কাজ নয়; জনগণের স্বার্থে কাজ করাই আপনাদের দায়িত্ব।”


সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, সরকার যদি গুম না করার ব্যাপারে নিশ্চিত থাকে, তাহলে আইনে এমন কোনো সুযোগ রাখা উচিত নয়, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে কেউ সেই সুযোগ নিতে পারে।


তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, “যদি গুম না-ই করবেন, তাহলে দরজাটা খোলা রাখছেন কেন?”


পরিবারের সদস্যদের ক্ষোভ


আলোচনা সভায় গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরাও তাঁদের স্বজনদের সন্ধান ও গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানান।


সম্প্রতি মোংলায় কোস্টগার্ড পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর থেকে নিখোঁজ মিরাজ শেখের সন্ধান দাবি করেন তাঁর বোন লিজা ইসলাম।


এইচআরএসএসের সাত দাবি


সভায় এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—মিরাজ শেখসহ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা, গুমের ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা, গুম কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং অতীতের গুমের ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করা।


এ ছাড়া গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত আইন সংশোধন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর স্বাধীনতা দেওয়ার দাবিও জানানো হয়।


সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন এইচআরএসএসের সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম। আরও বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী, এইচসিএইচআরের বাংলাদেশ কার্যালয়ের সহকারী মানবাধিকার কর্মকর্তা সাবরিন আহমেদসহ অন্যরা।