সাংবাদিককে কেন আইন জানতে হয়
ফাহিম ইসলাম,বিশেষ প্রতিনিধিঃ
সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমে একটি শব্দ, একটি ক্যাপশন কিংবা একটি ইঙ্গিত—সবকিছুই আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য আইন সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে মানহানি আইন না জানলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই বড় ধরনের আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন একজন সাংবাদিক।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানহানি সব সময় সরাসরি কটূক্তি বা অভিযোগের মাধ্যমেই হয় না। অনেক সময় ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য বা উপস্থাপনাও মানহানির কারণ হতে পারে। আইনের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইন্নোয়েন্ডো’ (Innuendo)।
এর একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ হলো ১৯২৯ সালের ‘ক্যাসিডি বনাম ডেইলি মিরর’ মামলা। সে সময় ব্রিটেনের জনপ্রিয় পত্রিকা ডেইলি মিরর “টুডে’স গসিপ” শিরোনামে মেক্সিকান সেনাবাহিনীর সাবেক জেনারেল ক্যাসিডির সঙ্গে এক নারীর ছবি প্রকাশ করে। ছবির ক্যাপশনে বলা হয়—তারা শিগগিরই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছেন। অথচ বাস্তবে তারা আগেই আইনগতভাবে স্বামী-স্ত্রী ছিলেন।
এই প্রকাশনার ফলে সমাজে ধারণা তৈরি হয় যে এতদিন তারা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে ছিলেন। এতে সম্মানহানির অভিযোগ এনে ক্যাসিডির স্ত্রী আদালতে মামলা করেন। আদালত এটিকে ‘ইন্নোয়েন্ডো মানহানি’ হিসেবে বিবেচনা করে ডেইলি মিররকে ৫০০ পাউন্ড জরিমানা করেন, যা সে সময় বড় অঙ্কের শাস্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
আইনজ্ঞদের মতে, এই মামলাটি সাংবাদিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—সব সত্য তথ্যই আইনি ঝুঁকিমুক্ত নয়, উপস্থাপনার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মানহানি মামলা সব সময় টেকে না। আইন অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে গণমাধ্যম সুরক্ষা পায়। যেমন—
প্রকাশিত তথ্য যদি সত্য হয় এবং জনস্বার্থে হয়, তবে সেটি মানহানি হিসেবে গণ্য হবে না। এখানে শুধু সত্যতা নয়, জনস্বার্থ প্রমাণ করাও জরুরি।
সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি বা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম নিয়ে সৎ বিশ্বাসে মতামত বা সমালোচনা প্রকাশ করলে সেটিও মানহানির আওতায় পড়ে না।
তবে এ ক্ষেত্রে চারটি বিষয় প্রমাণ করতে হয়—
১) এটি মতামত, তথ্য নয়
২) মতামতটি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট
৩) মতামতটি সত্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে
৪) যুক্তিসঙ্গত যে কেউ এমন মত দিতে পারেন
আইন বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গুজবভিত্তিক লেখা প্রায়ই দেখা যায়, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্পষ্ট মানহানির শামিল। মানুষের কৌতূহল থাকলেও ব্যক্তিগত গুজব সাধারণত জনস্বার্থের আওতায় পড়ে না—এ বিষয়টি আদালত কঠোরভাবে বিবেচনা করে।
আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো ‘প্রমাণের ভার’। ঐতিহাসিকভাবে মানহানি মামলায় অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব অনেক সময় পড়ে গণমাধ্যমের ওপর। সংবাদ সত্য হলেও যদি নির্ভরযোগ্য দলিল বা উৎস প্রকাশ করা সম্ভব না হয়, তাহলে সাংবাদিক আইনি বিপদে পড়তে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে ভুল তথ্য ও দ্রুত প্রকাশের চাপ বেড়েছে। এ অবস্থায় সাংবাদিকদের জন্য আইন জানা শুধু পেশাগত দক্ষতা নয়, বরং নিজেকে ও প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখার অন্যতম হাতিয়ার।
বা/মে২৪/ফা









