তপ্ত রোদে লাল সম্ভাবনা: যমুনার চরাঞ্চলে মরিচ ঘিরে কর্মসংস্থানের জোয়ার
নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া প্রতিনিধি:
তপ্ত রোদ আর ভ্যাপসা গরমকে যেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে লাল মরিচের ঝলমলে উপস্থিতি। যমুনা তীরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের চাতালে চাতালে এখন শুধু লাল রঙের সমারোহ। কোথাও কৃষকেরা জমি থেকে মরিচ তুলছেন, কোথাও নারী শ্রমিকরা সেগুলো রোদে শুকাচ্ছেন, আবার কেউ ব্যস্ত বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণে। সব মিলিয়ে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় মরিচ চাষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ, যা বদলে দিচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতির চিত্র।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে বগুড়ায় মোট ৪১ হাজার ৬২৫ বিঘা জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সারিয়াকান্দিতেই চাষ হয়েছে ২০ হাজার ২৫ বিঘা জমিতে। আর এই বিশাল উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন অন্তত ২৫ হাজার নারী শ্রমিক, যারা মরিচ তোলা, শুকানো ও বাছাইয়ের কাজে দিনভর ব্যস্ত সময় পার করছেন।
রোদে পুড়ে স্বপ্ন গড়া
সরেজমিনে সারিয়াকান্দির বিভিন্ন চাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাজারো নারী শ্রমিক মাথায় কাপড় বেঁধে তপ্ত রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মরিচ শুকাচ্ছেন। তাদের হাতের স্পর্শেই কাঁচা মরিচ রূপ নিচ্ছে শুকনা মসলায়।
চাতালে কাজ করা আঙুরি বেগম বলেন,
“অভাবের সংসারে সন্তানদের পড়াশোনা আর ঘরের খরচ চালাতে এই কাজ করতে হয়। পেটের তাগিদে রোদে পুড়াটা এখন আর কষ্ট মনে হয় না, বরং কাজ পেয়ে আমরা খুশি।”
একই চিত্র দেখা গেছে মালোপাড়া, নারচী ও ফুলবাড়ী এলাকাতেও। কমেলা রানী, মেরী খাতুনদের মতো হাজারো নারী এখন এই মৌসুমি কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বিতার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।
নারী শ্রমিকদের দক্ষতায় বাড়ছে চাহিদা
কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশি মরিচ তুলতে চার দফা এবং হাইব্রিড মরিচ তুলতে অন্তত ১০ দফা শ্রমিক প্রয়োজন হয়। এই শ্রমসাধ্য কাজে নারীদের ধৈর্য ও নিপুণতা বেশি হওয়ায় তাদের চাহিদাও বেড়েছে কয়েকগুণ। বর্তমানে একজন নারী শ্রমিক দৈনিক গড়ে ৩০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন, যা তাদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
বাজারে দামের ভিন্নতা
বর্তমানে বাজারে কাঁচা মরিচের দাম তুলনামূলক কম হলেও শুকনা মরিচের দাম বেশ চড়া। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি শুকনা মরিচ ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা খুচরা বাজারে ৫০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। ভালো দামের কারণে কৃষকরাও সন্তুষ্ট।
অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব
সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন,
“চলতি মৌসুমে মরিচের ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি বাজারজাতকরণে নারী শ্রমিকদের ভূমিকা অসাধারণ। এই খাত গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করছে।”
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
মরিচ চাষকে কেন্দ্র করে বগুড়ার চরাঞ্চলে যে অর্থনৈতিক জাগরণ তৈরি হয়েছে, তা শুধু কৃষকদের আয়ের পথই প্রশস্ত করছে না; বরং প্রান্তিক নারীদের জীবনমানেও আনছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
সব মিলিয়ে, যমুনার চরাঞ্চলের এই লাল মরিচ শুধু মসলার চাহিদাই পূরণ করছে না—এটি হয়ে উঠেছে হাজারো মানুষের জীবিকার প্রতীক, সংগ্রামের গল্প এবং সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।








