দিল্লিতে বিক্ষোভ, ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম
দিল্লিতে বিক্ষোভ, ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে

ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভোটার তালিকা সংশোধন ও ভোটাধিকার নিয়ে বিতর্কের জেরে বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়া বাতিল এবং নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। বিক্ষোভকারীদের আটকের ঘটনা ও রাজধানীতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।


আল-জাজিরার সাংবাদিক যশরাজ শর্মার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং চলাচলে বিধিনিষেধের ঘটনা ১৯৭৫ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানাচ্ছে সিজেপি। সংগঠনটি সংশোধিত তালিকা বাতিল ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের দাবি জানিয়েছে।


শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লিতে বিক্ষোভে অংশ নিতে জড়ো হওয়া অনেককে আটক করে পুলিশ। আন্দোলনকারীদের দাবি, বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপক এবং আরও দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটকের কথাও জানিয়েছে সিজেপি।


এর আগে শুক্রবার দিল্লিগামী ট্রেন বাতিল, একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং ইন্টারনেট পরিষেবা সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন রাজ্য থেকে দিল্লিতে আসতে চাওয়া শিক্ষার্থীদের বাধা দেওয়া এবং কয়েকটি এলাকায় তাঁদের আটক করার অভিযোগও তুলেছে আন্দোলনকারীরা। তবে এসব পদক্ষেপের বিষয়ে সরকারের বিস্তারিত বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।


জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা


১৯৭৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকার জরুরি অবস্থা জারি করেছিল। সে সময় নাগরিক অধিকার সীমিত করা, সংবাদপত্রে সেন্সরশিপ আরোপ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছিল। দিল্লিতে বর্তমান বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের কঠোর অবস্থানকে সেই সময়ের সঙ্গে তুলনা করছেন আন্দোলনকারীদের কয়েকজন নেতা ও সমর্থক।


সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারাও বিক্ষোভে অংশ নিতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।


আল-জাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে দিল্লির কয়েকজন বাসিন্দা বিক্ষোভকারীদের আটকের ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার সুযোগ সীমিত করা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।


ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক


ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়া নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই বিতর্ক চলছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। বিশেষ করে মুসলিম, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠী এবং বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।


প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় না রাখার অভিযোগ তুলেছেন সমালোচকেরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়নি।


এদিকে উত্তর ভারতের সাহারানপুরে এক ছাত্রসংগঠনের স্থানীয় সমন্বয়ককে বাড়িতে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁর দাবি, দিল্লির বিক্ষোভে অংশ নিতে যাওয়া ঠেকাতেই পুলিশ তাঁকে বাধা দিচ্ছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


মোদির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন


বিশ্লেষকদের মতে, বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের কঠোর অবস্থান মোদির রাজনৈতিক ভাবমূর্তির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। মোদির জীবনীকার ও লেখক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতে, জনদাবির মুখে নতি স্বীকার না করার ভাবমূর্তি ধরে রাখতে গিয়ে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।


অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও অধিকারকর্মী প্রশান্ত ভূষণ মনে করেন, সরকারের দমনমূলক পদক্ষেপ জনঅসন্তোষ আরও বাড়াতে পারে।


তবে বিক্ষোভের কারণে মোদি সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা দুর্বল হয়েছে, তা নির্ধারণের জন্য আরও তথ্য ও পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক, বিরোধীদের প্রতিবাদ এবং সরকারের প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও ভোটাধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।


সূত্র: আল-জাজিরা। বিশ্লেষক ও আন্দোলনকারীদের বক্তব্য মূল প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উপস্থাপিত।